মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত এক ছোট দ্বীপ- হরমুজ আইল্যান্ড, যা অনেকের কাছে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দ্বীপ হিসেবে পরিচিত।
মাত্র ১৬ বর্গমাইল আয়তনের দ্বীপটির অবস্থান ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। এর সৌন্দর্য একেবারেই ভিন্নগ্রহের মতো বলে মনে হয়।
হরমুজ দ্বীপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিচিত্র রঙের প্রাকৃতিক দৃশ্য। এখানে রয়েছে লাল বালির সৈকত, রঙিন পাহাড়, ঝলমলে লবণের গুহা এবং সোনালি উপত্যকা, যা একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছে এক অবিশ্বাস্য পরিবেশ।
দ্বীপটির আকৃতি অশ্রুবিন্দুর মতো, এর ভূমি গঠিত হয়েছে আগ্নেয় শিলা, লবণ ও বিভিন্ন খনিজের স্তর দিয়ে, যা সূর্যের আলোয় নানা রঙে ঝলমল করে।
বিশ্বভ্রমণকারী বেন, যিনি ৫০টির বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন, এই দ্বীপকে তার দেখা সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর জায়গা বলে উল্লেখ করেছেন।
তার মতে, দ্বীপটির অনেক স্থান এতটাই অদ্ভুত ও মনোমুগ্ধকর যে মনে হয় যেন অন্য কোনো গ্রহে চলে গেছেন।
দ্বীপটির অন্যতম আকর্ষণ ‘রেইনবো ভ্যালি’, যেখানে সবুজ, কমলা, বেগুনি, গোলাপি ও লাল রঙের স্তর একসঙ্গে মিশে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করেছে। এ কারণে দ্বীপটি ‘রেইনবো আইল্যান্ড’ নামেও পরিচিত। পশ্চিম পাশে রয়েছে ‘গডেস অব সল্ট’ নামে পরিচিত একটি পাহাড়, যা ঝকঝকে লবণের স্ফটিক দিয়ে তৈরি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই পাহাড়ের বিশেষ শক্তি রয়েছে যা নেতিবাচক শক্তি দূর করে ইতিবাচকতা বাড়ায়।
এছাড়া দ্বীপে রয়েছে ‘রেড বিচ’, যেখানে উজ্জ্বল লাল বালি সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানকার লাল মাটি, স্থানীয়ভাবে ‘গেলাক’ নামে পরিচিত, লৌহ অক্সাইডে সমৃদ্ধ এবং তা খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এই মাটি স্থানীয় রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বৃষ্টির সময় এই মাটির কারণে পানি লাল রঙ ধারণ করে, যা দেখতে অনেকটা রক্তধারার মতো লাগে। এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় শিল্পীরা রঙিন বালু দিয়ে বিশাল আকারের শিল্পকর্ম তৈরি করেন, যা পর্যটকদের আরও আকৃষ্ট করে।
দ্বীপে থাকার জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। বোহেমিয়ান ধাঁচের ‘মাজারাহ রেসিডেন্স’ নামের পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্পে মাটির তৈরি রঙিন গম্বুজ আকৃতির ঘর রয়েছে, যা দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এছাড়া ‘টার্টলস ক্লিফ’ এলাকায় সমুদ্র কচ্ছপের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রয়েছে, যেখানে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে অসংখ্য কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে।
সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলে ভ্রমণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও সাময়িক যুদ্ধবিরতি রয়েছে, তবুও ভ্রমণ সতর্কতা জারি আছে। সব মিলিয়ে, হরমুজ দ্বীপ তার অপার সৌন্দর্য সত্ত্বেও এখনও অনেকটাই অজানা ও বিচ্ছিন্ন, যেখানে পৌঁছানো যেমন কঠিন, তেমনি একবার গেলে তা ভুলে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব।