পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকেরা ছুটে এসেছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, লেক ও নির্মল পরিবেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন তারা। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ, সড়কপথে যাতায়াতের ভোগান্তি, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবের কারণে প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক এবার শ্রীমঙ্গলে আসেননি। ফলে ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দেখা যায়নি আগের বছরের মতো উপচে পড়া ভিড়।

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনগন্তব্য শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার বিস্তীর্ণ চা-বাগান, সবুজ পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

শ্রীমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চা-বাগান, বধ্যভূমি-৭১, বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, হরিণছড়া গলফ মাঠ, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), রাবার বাগান, বাইক্কা বিল, চম্পা লেক, সাত রঙের চা, লাল পাহাড়, খাসিয়াপল্লি ও মণিপুরিপাড়া। এছাড়া পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধও পর্যটকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে আসা পর্যটক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই রাতে শ্রীমঙ্গলে চলে এসেছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখছেন। তাঁর ভাষায়, চারপাশের সবুজ পরিবেশ, নির্মল বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনকে প্রশান্ত করে। এর আগে দুবার এলেও প্রতিবারই নতুন কিছু দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক চঞ্চল বড়ুয়া জানান, ঈদের আগের দিন পরিবারসহ শ্রীমঙ্গলে এসেছেন। চা-বাগান, বনাঞ্চল ও লেক এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকে আবহাওয়া আরামদায়ক থাকলেও পরে তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তারপরও প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশ তাঁদের মুগ্ধ করেছে।

রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, ঈদ উপলক্ষে রাধানগর এলাকার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছিল। তবে ঈদের দিন পর্যটকের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। পরে ধীরে ধীরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।

তিনি জানান, ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে পর্যটকের চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পর্যটক বাইরে ঘোরাঘুরির পরিবর্তে রিসোর্ট ও কটেজের ভেতরেই সময় কাটাচ্ছেন। এরপরও ছুটির বাকি সময়ে পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।

পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও আবাসন সুবিধা রয়েছে। বড় ছুটিগুলোকে কেন্দ্র করেই পর্যটন ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষা করেন। কিন্তু এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তাঁর মতে, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, দীর্ঘ যানজট, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং যাতায়াতের নানা সমস্যার কারণে অনেক ভ্রমণপিপাসু শ্রীমঙ্গল সফরের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।

এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের পরিদর্শক প্রজিত কুমার দাশ বলেন, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ সব পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পর্যটকেরা যাতে স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।