ঈদের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার। জেলার হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে দেশজুড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষের বড় একটি অংশ এবারও ছুটবেন শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে, এমন প্রত্যাশা পর্যটনসংশ্লিষ্টদের।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে জেলার পাঁচতারকা মানের হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ ছাড়। কোথাও ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খাবারের মেন্যুতে আনা হয়েছে নতুনত্ব। সাজসজ্জা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।
জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে পর্যটন এলাকাগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে যানজট নিয়ন্ত্রণেও কাজ করবে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারে ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চলে। চা-বাগানের সবুজ বিস্তার, পাহাড়ি টিলা, লেক, বনাঞ্চল ও ঝরনাকে ঘিরে প্রতিবছরই এখানে জড়ো হন হাজারো পর্যটক।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, বাইক্কার বিল, দার্জিলিং টিলা, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও বিভিন্ন চা-বাগান এলাকা।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা রাবার বাগান, আনারস বাগান, খাসিয়াপুঞ্জি, মনিপুরী তাঁতশিল্প, টি মিউজিয়াম, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
পর্যটকদের যাতায়াত সুবিধায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে শতাধিক চান্দের গাড়ি। বিশেষ করে পাহাড়ি টিলা ও চা-বাগান এলাকাগুলো ঘুরতে এসব খোলা জিপ জাতীয় যানবাহনের চাহিদা বেশি থাকে।
জেলা পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদের পরদিন থেকে সাধারণত হোটেল-রিসোর্টে বুকিং বাড়তে শুরু করে। আগামী ২৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বুকিং চললেও এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। গত ঈদুল ফিতরে শেষ মুহূর্তে অনেক পর্যটক বুকিং বাতিল করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব, অতিবৃষ্টি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা পর্যটক আগমনে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকার সংযোগ সড়কগুলোর দুরবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও নিসর্গ নিরব ইকো কটেজের মালিক কাজী সামছুল হক বলেন, শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায় সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। তবে এবার এখন পর্যন্ত বুকিং হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ঈদের দিন পর্যন্ত অমুসলিম পর্যটকদের বুকিং তুলনামূলক বেশি থাকলেও ঈদের পর মুসলিম পর্যটকদের চাপ বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি জানান, জেলায় শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট থাকলেও নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হওয়ায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পাশাপাশি ট্রেনের টিকিট সংকটও পর্যটন খাতের জন্য বড় সমস্যা। ঢাকা-সিলেট রুটে নতুন ট্রেন চালু হলে পর্যটক বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জিএম আরমান খান বলেন, চা-বাগানের সৌন্দর্য ও প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় মৌলভীবাজারে সারা বছরই পর্যটকের আনাগোনা থাকে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চললেও ঈদের ছুটিতে ভালো পর্যটক সমাগমের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সিনিয়র ট্যুর গাইড সৈয়দ রিফাত জামান জানান, বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও এখন মূলত উচ্চ আয়ের পর্যটকরাই বেশি আসছেন। ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। অনেক দেশি পর্যটকও এখন খরচ কমাতে দিনে ঘুরে রাত না কাটিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঈদের ছুটিতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে বাড়ানো হবে নজরদারি ও টহল কার্যক্রম।