বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কেওক্রাডংয়ের পাদদেশে অবস্থিত সুংসাং পাড়া এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন গন্তব্য। বম সম্প্রদায়ের শান্ত এই পাহাড়ি জনপদে পৌঁছানোর যাত্রাপথ যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি প্রকৃতির সৌন্দর্যও মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুদের। তবে এই পথে ভ্রমণের আগে প্রশাসনিক নিয়ম, নিবন্ধন ও নিরাপত্তা নির্দেশনা সম্পর্কে প্রস্তুত থাকা জরুরি।

বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত সুংসাং পাড়া কেওক্রাডং পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা বম সম্প্রদায়ের একটি মনোরম পাহাড়ি গ্রাম। পাসিং পাড়া থেকে খাড়া ঢালু পথ বেয়ে নামলেই চোখে পড়ে পাহাড়ের ঢালে সারিবদ্ধ ঘরবাড়ি, সবুজ জুমচাষ, মেঘে ঢাকা উপত্যকা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য।

বাংলাদেশের অন্যতম নির্জন পাহাড়ি জনপদ হিসেবে পরিচিত এই গ্রাম ট্রেকার ও মোটরসাইকেল ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। পাহাড়ি আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কখনো চারপাশ ঘন মেঘে ঢেকে যায়, আবার মুহূর্তেই রোদ ঝলমলে হয়ে ওঠে। এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশই দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

কী দেখবেন

সুংসাং পাড়ার পথে মুনলাই পাড়া, বগালেক, দার্জিলিং পাড়া, কেওক্রাডং ও পাসিং পাড়া অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি স্থানই নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত।

সুংসাং পাড়ায় প্রবেশের আগে একটি পাহাড়ি দর্শনবিন্দু রয়েছে। এখান থেকে নিচের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক এবং চারপাশের সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। বৃষ্টির পর এই স্থানটি আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাও পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ, পরিচ্ছন্ন বসতি, ছোট দোকানে পাহাড়ি ফল এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে এখানে। তবে স্থানীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভ্রমণ করা উচিত।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৮৭০ থেকে ৯৫০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকার মধ্যে। যাত্রায় সময় লাগে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।

বান্দরবান থেকে লোকাল বাসে রুমা বাজার যেতে হয়। পথে সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয়, তাই পরিচয়পত্র বা এর ফটোকপি সঙ্গে রাখা জরুরি।

রুমা বাজারে নিবন্ধন সম্পন্ন করে অনুমোদিত গাইড নিতে হবে। প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিবন্ধিত গাইড ছাড়া নির্ধারিত পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের অনুমতি নেই। এরপর মোটরসাইকেল বা চাঁদের গাড়িতে মুনলাই পাড়া, বগালেক, দার্জিলিং পাড়া, কেওক্রাডং ও পাসিং পাড়া হয়ে সুংসাং পাড়ায় পৌঁছানো যায়।

কোথায় থাকবেন

পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে দার্জিলিং পাড়া বা পাসিং পাড়ার মূল জনবসতিতে রাত্রিযাপনের অনুমতি নেই।

সবচেয়ে জনপ্রিয় আবাসনের স্থান বগালেক, যেখানে স্থানীয়দের পরিচালিত কটেজ ও আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া সুংসাং পাড়ার সেনাক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায়ও নিরাপদ কটেজে থাকার সুযোগ রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় কেওক্রাডংয়ের জিরো কিলোমিটার এলাকায়ও সীমিত আবাসনের ব্যবস্থা পাওয়া যায়।

কোথায় খাবেন

পাহাড়ি এলাকায় আগাম অর্ডার ছাড়া খাবার পাওয়া কঠিন। তাই গাইডের মাধ্যমে আগে থেকেই খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত।

মুনলাই পাড়ায় পাহাড়ি হারবাল চা ভ্রমণকারীদের কাছে জনপ্রিয়। সুংসাং পাড়া ও আশপাশের এলাকায় সাধারণত জুমের চালের ভাত, পাহাড়ি মুরগি, ডাল ও আলুভর্তাসহ স্থানীয় খাবার পরিবেশন করা হয়।

ভ্রমণ টিপস

সুংসাং পাড়ার পাহাড়ি সড়ক বাংলাদেশের অন্যতম কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং রুট হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে রাস্তা অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। তাই অভিজ্ঞ স্থানীয় চালক ব্যবহার করা, আগে থেকেই অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করা এবং প্রশাসনের সব নির্দেশনা মেনে চলাই নিরাপদ ভ্রমণের প্রধান শর্ত।

তথ্যবক্স

অবস্থান: পাইন্দু ইউনিয়ন, রুমা উপজেলা, বান্দরবান
প্রধান আকর্ষণ: কেওক্রাডং, বগালেক, মুনলাই পাড়া, পাসিং পাড়া, পাহাড়ি দর্শনবিন্দু
উপযুক্ত সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ
অবশ্যই লাগবে: জাতীয় পরিচয়পত্র, নিবন্ধন, অনুমোদিত গাইড