মেঘালয়ের পাহাড়, উড়ন্ত মেঘ, পাখির ডাক আর ফুলে সাজানো পরিচ্ছন্ন পথ। সীমান্তঘেঁষা এমন শান্ত প্রকৃতির দেখা মেলে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ঝুমগাঁওয়ে। শত বছরের পুরোনো মাটির ঘর ও গারো জনগোষ্ঠীর সুশৃঙ্খল বসতি মিলিয়ে গ্রামটি এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।
সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে বাংলাবাজার ইউনিয়নের মেঘালয় সীমান্তে ঝুমগাঁওয়ের অবস্থান। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত গ্রামটিতে বর্তমানে ৪০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে।
গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, আর দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত ধানক্ষেত। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১২৩০-এর কাছেই রয়েছে একটি মাটির ঘর, যার একাংশ বাংলাদেশে এবং অন্য অংশ ভারতে অবস্থিত।
সিঁড়ি পেরিয়ে গ্রামের প্রবেশপথে উঠলেই চোখে পড়ে প্রায় ৯ ফুট প্রশস্ত পাকা সড়ক। দুই পাশে লোহার রেলিং ঘেঁষে রঙিন পাতাবাহার ও নানা ফুলের গাছ। প্রায় ৪০০ মিটার দীর্ঘ ও ১০০ মিটার প্রশস্ত গ্রামজুড়ে রয়েছে কাঁঠাল, লেবু, জাম্বুরা ও বিভিন্ন ফলদ গাছের বাগান।
ঝুমগাঁওয়ের ৪০টি ঘরের মধ্যে ৩০টির ছাদ ঢেউটিনের এবং চারপাশ মাটির দেয়ালে তৈরি। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘরগুলোও পর্যটকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ। বাড়ির আঙিনা ও বারান্দায় টবে সাজানো পাহাড়ি ফুল গ্রামটির সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।
গ্রামের তরুণ মারাক বলেন, আগে এখানে ফুলের গাছ ছিল না। গ্রামবাসী নিজেরাই ফুল ও পাতাবাহারের চারা লাগানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে পুরো গ্রাম ফুলের বাগানের রূপ নেয়।
শুকুমার মারাক জানান, গ্রামবাসী নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। পর্যটকেরাও নির্ধারিত স্থানে আবর্জনা ফেললে গ্রামের পরিবেশ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শত শত মানুষ ঝুমগাঁও দেখতে আসেন। ছুটির দিনে পর্যটকের ভিড় আরও বাড়ে। তবে পর্যটকদের জন্য বসার স্থান, শৌচাগার ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসাইন বলেন, সরকার উদ্যোগ নিলে ঝুমগাঁওকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরে ঝুমগাঁওয়ের জন্য প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে কূপ স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও পানির সমস্যা সমাধানে প্রশাসন কাজ করবে।
প্রকৃতি, সীমান্তের ভূদৃশ্য ও গারো জনগোষ্ঠীর পরিচ্ছন্ন গ্রামীণ পরিবেশ কাছ থেকে দেখতে চাইলে ঝুমগাঁও হতে পারে সুনামগঞ্জ ভ্রমণের ব্যতিক্রমী গন্তব্য। তবে পর্যটকদের স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং নির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।