ভ্রমণের চেয়ে আনন্দের আর কী-ই বা হতে পারে! তবে ভ্রমণে গেলে বেশ কিছু অদ্ভুত অভ্যাস, রহস্য ও প্রচলিত ধারণাও রয়েছে।

বাড়িতে যে কাজগুলো আমরা প্রতিদিন করি— যেমন সুপারমার্কেটে যাওয়া, রাতের খাবার খাওয়া কিংবা বারে বসা—ছুটিতে গিয়ে সেগুলোই হঠাৎ বিশাল কোনো অভিযানের মতো মনে হয়। এমনকি স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা করতে যাওয়াটাও তখন মনে হয় মার্কো পোলোর মতো কোনো দুঃসাহসিক অভিযানে বেরিয়েছি!

বিদেশে গেলে কখনো কখনো মাথাই যেন গুলিয়ে যায়। যেমন আমেরিকানরা আপেলের রসকে ‘সাইডার’ বলে কেন—তা বুঝতে গিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া, কিংবা মাদ্রিদের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে সেটিকে একেবারে ফাঁকা দেখে ভাবা, ‘এখানে কেউ খেতে আসে না নাকি?’ পরে বুঝতে পারা, স্থানীয়রা রাত ১০টার পর খেতে বের হয়। ভ্রমণের সময় এমন অসংখ্য অলিখিত নিয়ম ও অজানা সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।

এখানে ভ্রমণজগতের এমন সাতটি বড় রহস্য তুলে ধরা হলো, সঙ্গে রয়েছে সেগুলোর ব্যাখ্যাও—যাতে ছুটিতে গিয়ে আপনি অপ্রস্তুত না হন।

১. জাপানে পাবলিক ডাস্টবিন নেই কেন?

পৃথিবীর অন্যতম সেরা ভ্রমণগন্তব্য জাপান। তবে এশিয়ার অন্য দেশ তো বটেই, বিশ্বের অনেক জায়গার তুলনায় দেশটির জীবনযাপন ও নিয়মকানুন অনেকটাই আলাদা।

জাপানে গিয়ে অনেক সময় এমন কিছু দেখবেন, যা প্রথমে একেবারেই অর্থহীন মনে হবে। পরে বুঝবেন, শুধু এটি কাজই করে না—অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়েও ভালোভাবে কাজ করে।

তবে পাবলিক ডাস্টবিন না থাকার বিষয়টি তেমন নয়। জাপানের রাস্তাঘাটে আপনি সাধারণত ডাস্টবিন দেখতে পাবেন না। ফলে খালি পানির বোতলটিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতে নিয়ে ঘুরতে হতে পারে।

বিশেষ করে জাপানের ‘সেভেন-ইলেভেন’ দোকানগুলোতে প্রায় প্রতিটি খাবার অতিরিক্ত প্লাস্টিকে মোড়ানো থাকে। তবে আবর্জনা ফেলার একটি সহজ উপায় হলো কোনো কনভেনিয়েন্স স্টোরে গিয়ে ভেতরের ডাস্টবিন ব্যবহার করা।

এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, জাপানে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাবার খাওয়ার প্রচলন নেই; এটিকে অভদ্র আচরণ হিসেবে দেখা হয়।

দ্বিতীয়ত, আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—১৯৯৫ সালে টোকিও মেট্রোতে সারিন গ্যাস হামলার পর অনেক পাবলিক ডাস্টবিন সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে স্থানীয়দের মতো আপনাকেও নিজের আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হতে পারে।

২. বিদেশের সুপারমার্কেটে ঘুরতে এত ভালো লাগে কেন?

নিজের দেশে সুপারমার্কেটে যাওয়া অনেকের কাছেই নিছক প্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু ছুটিতে বিদেশে গেলে সুপারমার্কেটে ঢোকাটাই যেন আলাদা এক আকর্ষণ।

প্রথমেই দেখতে ইচ্ছা করে, পরিচিত কোন কোন খাবার সেখানে পাওয়া যায় বা যায় না। এরপর থাকে অদ্ভুত স্বাদের চিপস কিংবা ফ্রিজে রাখা বিচিত্র ধরনের কোমল পানীয় আবিষ্কারের কৌতূহল।

মজার বিষয় হলো, শুধু আপনার নয়—অন্য অনেক ভ্রমণকারীরও একই অভিজ্ঞতা।

এর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। অপরিচিত প্যাকেজিং, নতুন ধরনের লেখা ও অচেনা ভাষা আমাদের মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে এবং ডোপামিনের মাত্রা বাড়াতে পারে।

৩. ইতালিতে সকাল ১১টার পর ক্যাপুচিনো পান করা প্রায় অপরাধ কেন?

ইতালি ভ্রমণের জন্য অসাধারণ একটি দেশ। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ফুটবলের পাশাপাশি দেশটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো খাবার ও পানীয়।

অনেকেই ইতালি থেকে ফেরার সময় কয়েক কেজি ওজন বাড়িয়ে ফেরার প্রত্যাশা করেন। তবে সেখানে গিয়ে বোঝা যায়, ইতালীয়রা তাদের খাবার ও পানীয়ের ব্যাপারে কতটা কঠোর এবং ঐতিহ্যনির্ভর।

তবে ইতালির কফি সংস্কৃতির কিছু অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। ইতালিতে দিনের যেকোনো সময় ইচ্ছেমতো কফি অর্ডার করার বদলে দিনের সময় অনুযায়ী কফি বেছে নেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। দুধযুক্ত কফি সাধারণত সকালের জন্য নির্ধারিত, কারণ এগুলো তুলনামূলক ভারী। আর খাবারের পর সাধারণত এসপ্রেসো পান করা হয়, যা হজমে সহায়ক বলে মনে করা হয়।

তাই সকাল ১১টার পর ক্যাপুচিনো অর্ডার করলে অবাক হবেন না—স্থানীয়রা আপনাকে এমনভাবে তাকাতে পারে, যেন আপনি কোনো অপরাধ করেছেন!

৪. বার্বাডোসে ক্যামোফ্লাজ পোশাক নয়

বার্বাডোসে ক্যামোফ্লাজ বা সামরিক ছদ্মবেশের নকশাযুক্ত পোশাক পরা একেবারেই ভালো ধারণা নয়।

অনেক দেশে ক্যামোফ্লাজ পোশাক ফ্যাশনের অংশ হলেও বার্বাডোসে এটিকে সামরিক বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

আইন অনুযায়ী, সেখানে ক্যামোফ্লাজ পোশাক পরার অধিকার মূলত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য সীমাবদ্ধ। জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশেও একই ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।

অর্থাৎ ছুটিতে গিয়ে প্রিয় ক্যামোফ্লাজ শর্টস বা অন্যান্য পোশাক পরার পরিকল্পনা থাকলে আগে স্থানীয় আইন সম্পর্কে জেনে নেওয়াই ভালো।

৫. আইসল্যান্ডে শিশুকে বাইরে রেখে দিলে সামাজিক সেবা সংস্থায় ফোন করার দরকার নেই

উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে জীবনযাপনের অনেক কিছুই অন্যদের তুলনায় আলাদা। পরিচ্ছন্ন ও সাদামাটা ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে দীর্ঘ গ্রীষ্মকালীন ছুটি— সব কিছুতেই রয়েছে ভিন্নতা।

আইসল্যান্ডের একটি অদ্ভুত রীতিও রয়েছে। সেখানে বাবা-মায়েরা কখনো কখনো শিশুকে প্র্যামে রেখে ক্যাফের ভেতরে কফি খেতে যান, আর শিশুটি বাইরে থাকে।

বিশ্বাস করা হয়, খোলা বাতাস শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং তাদের জন্য উপকারী। দেশটির অত্যন্ত কম অপরাধের হারও হয়তো এই রীতিকে সম্ভব করে তুলেছে।

তাই রেইকিয়াভিকে কোনো ক্যাফের বাইরে প্র্যামে থাকা শিশুকে দেখলে স্থানীয় সামাজিক সেবা সংস্থায় ফোন করার প্রয়োজন নেই—এটি সেখানে প্রচলিত একটি সংস্কৃতি।

৬. ভিয়েতনামে রাস্তা পার হওয়া মানে নিজের জীবন নিজের হাতে তুলে নেওয়া!

ভিয়েতনাম থেকে সদ্য ফেরা কাউকে দেখলেই আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, সে হ্যানয়ের রাস্তা পার হওয়ার অভিজ্ঞতা পেয়েছে কি না। কারণ বিষয়টি নিয়ে তারা কথা বলবেই!

ভিয়েতনামের শহরগুলোতে গাড়ি চলাচল থাকলেও রাস্তায় মোটরসাইকেল বা মোপেডের আধিক্য অনেক বেশি। বিশেষ করে হ্যানয় ও হো চি মিন সিটির রাস্তায় অসংখ্য মোপেড এমনভাবে ছুটে চলে, যেন মানুষের শরীরের রক্তনালিতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।

তাই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি বা মোটরসাইকেল থামার অপেক্ষা করলে খুব একটা লাভ হবে না।

সেখানে প্রচলিত অলিখিত নিয়ম হলো—রাস্তা পার হতে চাইলে ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে পড়ুন। দৌড়াবেন না। নিজের গতি ও চলার দিক যতটা সম্ভব স্থির ও অনুমানযোগ্য রাখুন। এতে মোটরসাইকেল চালকেরা আপনার গতিপথ বুঝে আপনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারবেন।

প্রথমবার বিষয়টি ভয়ংকর মনে হতে পারে। কিন্তু একবার সাহস করে রাস্তায় নামার পর যখন দেখবেন আপনার সামনে দিয়ে মোটরসাইকেলের বিশাল স্রোত দুই ভাগ হয়ে আপনাকে পার হওয়ার জায়গা করে দিচ্ছে, তখন অভিজ্ঞতাটি বেশ রোমাঞ্চকরও মনে হতে পারে।

৭. নেদারল্যান্ডসে মানুষ জানালায় পর্দা টানে না কেন?

নেদারল্যান্ডসের নিচতলার জানালাগুলো সাধারণত দুই ধরনের—কোনোটি বন্ধ, আর কোনোটি খোলা।

বন্ধ জানালা দেখলে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি ভাবার কিছু নেই। তবে জানালা খোলা এবং ভেতরের ঘর দেখা গেলে সেটি সাধারণত আবাসিক এলাকা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এটি এমন একটি বিষয়, যা প্রথমে আপনার চোখে নাও পড়তে পারে। কিন্তু একবার বিষয়টি বুঝে গেলে এরপর আর এটি চোখ এড়াবে না।

এর পেছনে রয়েছে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং স্বচ্ছতার ধারণা। পর্দা না টেনে জানালা খোলা রাখার মাধ্যমে যেন বোঝানো হয়— বাড়ির ভেতরে লুকানোর মতো কিছু নেই এবং বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।