বর্ষা এলেই নতুন রূপে সেজে ওঠে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। বিস্তীর্ণ জলরাশি, হিজল-করচের বন, মেঘালয়ের পাহাড়ের পাদদেশ, জাদুকাটা নদী এবং হাউসবোটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বর্ষাকালীন পর্যটন গন্তব্য। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ভিড় করেন এখানে।
টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার এলাকা। বর্ষায় পুরো হাওর জলমগ্ন হয়ে এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্ম দেয়।
হাওর ভ্রমণের প্রধান প্রবেশপথ তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাট। এখান থেকে বিভিন্ন ধরনের হাউসবোট ও ট্রলারে করে পর্যটকেরা হাওর ভ্রমণে বের হন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাউসবোটে থাকা, খাবার এবং রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকায় দুই দিন এক রাতের ভ্রমণ এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়।
ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার। বলাই নদীর তীরে অবস্থিত এই স্থান থেকে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি ও হিজল বন একসঙ্গে দেখা যায়। স্বচ্ছ পানিতে নৌকাভ্রমণ ও নিরাপদ স্থানে জলকেলিও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
হাওর ভ্রমণের সঙ্গে একই সফরে ঘুরে দেখা যায় সীমান্তঘেঁষা টেকেরঘাট, নীলাদ্রি লেক, লাকমা ছড়া, জাদুকাটা নদী, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিমুল বাগান এবং বারিক্কা টিলা। নীলাদ্রি লেকের নীল জল, মেঘালয় পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং জাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানি প্রকৃতিপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
রাতের হাউসবোট ভ্রমণও টাঙ্গুয়ার অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষার বৃষ্টি, হাওরের নীরবতা এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। অধিকাংশ হাউসবোটে টাটকা হাওরের মাছ, দেশি খাবার ও বারবিকিউ পরিবেশন করা হয়।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। এছাড়া ট্রেনে সিলেট গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে সুনামগঞ্জ পৌঁছানো যায়। সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা বা রিজার্ভ গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টায় তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাটে পৌঁছানো সম্ভব। সেখান থেকেই শুরু হয় টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ।
কোথায় থাকবেন
টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যবস্থা হাউসবোটে রাত্রিযাপন। বিভিন্ন বাজেটের হাউসবোট পাওয়া যায়। পর্যটনের মৌসুমে আগে থেকেই বুকিং করে রাখা ভালো। চাইলে দিনের সফর শেষে সুনামগঞ্জ শহরের আবাসিক হোটেলেও অবস্থান করা যায়।
কী খাবেন
হাউসবোটে সাধারণত সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকে। টাটকা মাছ, দেশি মুরগি, ভর্তা, সবজি, ডাল এবং বারবিকিউ ভ্রমণের বিশেষ আকর্ষণ। আগে থেকেই খাবারের তালিকা নির্ধারণ করলে সুবিধা হয়।
ভ্রমণে সতর্কতা
বর্ষাকালে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে যাত্রা করুন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে গভীর পানিতে নামবেন না। হাওরে প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলবেন না। সীমান্ত এলাকায় চলাচলের সময় বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতন থাকুন।
তথ্যবক্স
- গন্তব্য: টাঙ্গুয়ার হাওর, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ
- ভ্রমণের সেরা সময়: আষাঢ় থেকে ভাদ্র
- প্রধান আকর্ষণ: ওয়াচ টাওয়ার, নীলাদ্রি লেক, জাদুকাটা নদী, লাকমা ছড়া, বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান
- ভ্রমণের ধরন: হাউসবোট, ট্রলার ও স্পিডবোট