বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা কাছ থেকে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের জাদুঘর হতে পারে অন্যতম গন্তব্য। এখানে সংরক্ষিত শতাধিক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, শিল্প, পোশাক, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। রাঙ্গামাটি ভ্রমণে প্রকৃতির পাশাপাশি সংস্কৃতি অন্বেষণেও এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ।
রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের আসামবস্তি এলাকার ভেদভেদীতে প্রায় সাড়ে তিন একর পাহাড়ি টিলাজুড়ে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। রাঙ্গামাটি শহরের কেন্দ্র বা প্রবেশমুখ থেকে রিকশা, অটোরিকশা কিংবা স্থানীয় পরিবহনে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়।
ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরে অবস্থিত রাঙ্গামাটি জাদুঘর বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সংরক্ষণ এবং তা দেশের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে পাহাড়ি তাঁত, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হুক্কা, অস্ত্র, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র, হস্তলিপি, মাথাল, ব্যাগ, অলংকার, শাড়ি, নাকের নথ, গলার মালা, বর্ম, ঝুড়ি, পানির পাত্র, পুতুল, সাপের চামড়া এবং বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্রসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী। এসব সংগ্রহ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন, শিল্প ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিবর্তনের পরিচয় বহন করে।
জাদুঘরের পাশাপাশি ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন তিনতলা জাদুঘর ভবন, প্রশাসনিক ভবন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, শিল্পী হোস্টেল এবং ২৫০ আসনের একটি মিলনায়তন। এখানে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রাঙ্কন, তাঁত বুনন, পোশাক তৈরি, আবৃত্তি ও প্রমিত উচ্চারণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষা, গবেষণা এবং দুর্লভ প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও প্রদর্শনের কাজও পরিচালিত হয়।
ইনস্টিটিউটের গ্রন্থাগারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বইয়ের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন গ্রন্থ রয়েছে। দর্শনার্থীরা সেখানে বসে বই পড়ার সুযোগও পান।
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৭৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা শুরু করে এটি। ১৯৮১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। ২০১০ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন কার্যকর হওয়ার পর এর বর্তমান নামকরণ করা হয় এবং এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়।
রাঙ্গামাটি জাদুঘর শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই জাদুঘর ভ্রমণ পর্যটকদের জন্য যোগ করে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
• অবস্থান: ভেদভেদী, আসামবস্তি, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক
• আকর্ষণ: পাহাড়ি সংস্কৃতির জাদুঘর, গ্রন্থাগার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
• উপযোগী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য অন্যতম দর্শনীয় স্থান