ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি ঘিরে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠার কথা ছিল পার্বত্য জেলা বান্দরবানের। তবে ঈদের তৃতীয় দিনেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এতে হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।

শনিবার জেলার নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, রুপালি ঝরনা ও অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কোথাও তেমন ভিড় নেই। অথচ অতীতের ঈদ মৌসুমে এসব স্থানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক না আসায় অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। ফলে দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও বিপুলসংখ্যক কক্ষ খালি পড়ে রয়েছে।

হোটেল মালিকদের ভাষ্য, গত বছরের ঈদের একই সময়ে বান্দরবানে আবাসনের জন্য রুম পাওয়া ছিল কঠিন। এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আবাসন খাতের পাশাপাশি পরিবহন, খাদ্য ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্প্রতি পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ এবং ঈদের পর তুলনামূলক কম ছুটি থাকায় অনেক ভ্রমণপিপাসু বান্দরবান সফরের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও ভ্রমণ ব্যয়ের বৃদ্ধি পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার রোয়াংছড়ির জনপ্রিয় দেবতাখুমে প্রায় ৮০০ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। গত ঈদের ছুটিতে সেখানে প্রায় দুই হাজার পর্যটকের আগমন ঘটেছিল।

একইভাবে থানচি উপজেলায় গত ঈদে দুই হাজারের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করলেও এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৪০০-তে।

তবে রুমা উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। বগালেক ও কেওক্রাডং কেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রমে এবারও দুই থেকে আড়াই হাজার পর্যটকের আগমন ঘটেছে, যা গত ঈদের প্রায় সমপর্যায়ের।

জেলা সদরের অন্যতম আকর্ষণ নীলাচলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৪০০ পর্যটকের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় কম।

হোটেল হিলভিউয়ের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার মো. ইউনুছ বলেন, আজ এবং আগামীকালের জন্য তাদের হোটেলে প্রায় শতভাগ বুকিং রয়েছে।

অন্যদিকে হোটেল হিল্টনের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার তপন বড়ুয়া জানান, বর্তমানে তাদের হোটেলে প্রায় ৬০ শতাংশ কক্ষ বুকড রয়েছে। আগামী দিনের জন্য বুকিং রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। অন্যান্য সময়ে রুম দিতে হিমশিম খেতে হলেও এবার বেশ কিছু কক্ষ খালি রয়েছে।

রোয়াংছড়ি পর্যটক গাইড সমিতির সাধারণ সম্পাদক চিংনু মং মারমা বলেন, অন্যান্য ঈদের তুলনায় এবার দেবতাখুমে পর্যটকের উপস্থিতি কম। সারাদিনে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন।

রুমা পর্যটক গাইড সমিতির সভাপতি লাল রুকুয়াল বম বলেন, গত ঈদের মতো এবারও বগালেক ও কেওক্রাডং এলাকায় দুই থেকে আড়াই হাজার পর্যটক এসেছেন।

থানচি পর্যটক গাইড অফিসের সহকারী উত্তম ত্রিপুরা জানান, গত ঈদে প্রায় দুই হাজার পর্যটক এলেও এবার শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন।

বান্দরবান হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভ্রমণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বান্দরবানে পর্যটন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আশানুরূপ পর্যটক আসেননি। ফলে জেলার অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি কক্ষ খালি রয়েছে।

এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে। বান্দরবান ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ভ্রাম্যমাণ টহল দলের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, ঝরনা ও সবুজে ঘেরা বান্দরবান এখনও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবং ভ্রমণবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকলে আগামী দিনগুলোতে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে পার্বত্য এই জেলা।