চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে দীর্ঘদিনের একটি বড় সংকট ছিল মানসম্মত আবাসন ও আধুনিক পর্যটন সুবিধার অভাব। প্রায় আট বছরের অপেক্ষা, দফায় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি এবং বাজেট সংশোধনের পর অবশেষে সেই সংকট কাটতে যাচ্ছে। প্রায় ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পারকি পর্যটন কমপ্লেক্স আগামী জুন মাসেই পুরোপুরি প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত পারকি সৈকত বহু বছর ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে পর্যটকদের জন্য আধুনিক অবকাঠামো না থাকায় সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। নতুন এই পর্যটন কমপ্লেক্স চালু হলে পারকি সৈকতে পর্যটন শিল্পে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক মাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে চলছে সৌন্দর্যবর্ধন ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ। আগামী জুনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শেষ হবে।

২০১৮ সালে শুরু হয় প্রকল্প

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পারকি সৈকত আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ১৩ দশমিক ৩৬ একর জায়গাজুড়ে পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই বছর।

তিনটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেলেও ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়। পরে প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

এরপরও কাজের ধীরগতির কারণে একাধিকবার মেয়াদ বাড়াতে হয়। সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।

যা থাকছে পর্যটন কমপ্লেক্সে

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের মূল অবকাঠামোগত কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশদ্বার এবং পার্কিং জোন নির্মাণও সম্পন্ন হয়েছে।

এই কমপ্লেক্সে থাকছে ১০টি সিঙ্গেল কটেজ, যার প্রতিটির আয়তন ৮০০ বর্গফুট। এছাড়া ১ হাজার ৩৫০ বর্গফুট আয়তনের চারটি ডুপ্লেক্স কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনতলাবিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস ভবনে থাকবে অফিস ও রেস্তোরাঁ। প্রতিটি তলার আয়তন ৬ হাজার ৩২৩ বর্গফুট। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা সার্ভিস ব্লক, সাবস্টেশন ভবন, সিকিউরিটি রুম, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং দুটি পিকনিক শেড।

প্রতিটি পিকনিক শেডে রান্নাঘর ও টয়লেট সুবিধাসহ ১ হাজার ৭০৮ বর্গফুট জায়গা রাখা হয়েছে। এছাড়া শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা ও একটি হ্রদও রাখা হয়েছে প্রকল্প এলাকায়।

কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও নির্মাণকাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

পারকি বিচ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ২০২০ সালে উত্তর পাশের সীমানাপ্রাচীর হেলে পড়ে। পরে ২০২৪ সালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দক্ষিণ পাশের প্রাচীর ধসে যায়। বর্তমানে লবণাক্ত মাটি দিয়ে ভরাটের কাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ত্রুটিগুলো ইতোমধ্যে মেরামত করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রকৌশলী অসীম শীল জানান, কাজের কিছু জটিলতা থাকলেও এখন সব অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা হয়েছে।

পরিচালনা পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত নয়

প্রকল্প পরিচালক মাজেদুর রহমান বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পর এটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হবে নাকি টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারকি পর্যটন কমপ্লেক্স চালু হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।