ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সময়ের সীমাবদ্ধতা, যানজট, বাড়তি খরচ কিংবা কর্মব্যস্ততার কারণে অনেকেই রাজধানীতেই কাটান ঈদের ছুটি। তবে ঢাকাতেই রয়েছে এমন অনেক দর্শনীয় স্থান, যেখানে ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও বিনোদনের সমন্বয়ে পরিবার নিয়ে কাটানো যায় দারুণ সময়।

ঈদের ছুটিতে রাজধানীর বিনোদনকেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পার্কগুলোতে বাড়ে দর্শনার্থীর ভিড়। শিশুদের জন্য যেমন রয়েছে আনন্দের নানা আয়োজন, তেমনি বড়দের জন্যও রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ। পরিবার নিয়ে ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসার জন্য ঢাকার কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্য নিয়ে এই আয়োজন।

হাতিরঝিল
রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র হাতিরঝিল এখন ঢাকাবাসীর অবকাশযাপনের পরিচিত স্থান। লেকের ওপর দৃষ্টিনন্দন সেতু, আলোকসজ্জা, ওয়াটার ট্যাক্সি ও খোলামেলা পরিবেশ হাতিরঝিলকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

ঈদের সন্ধ্যা ও রাতে পরিবার নিয়ে এখানে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। লেকপাড়ে আড্ডা, নৌভ্রমণ কিংবা ফুচকা-চটপটির স্বাদে জমে ওঠে উৎসবমুখর পরিবেশ। শিশুদের কাছেও স্থানটি বেশ জনপ্রিয়।

বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সময়টিই ঘোরার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এখানে প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না। তবে নৌকা বা ওয়াটার ট্যাক্সিতে ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত ভাড়া দিতে হয়।

বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর
রাজধানীর বিজয় সরণিতে অবস্থিত বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর বর্তমানে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এ জাদুঘরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সেনাবাহিনীর ইতিহাস, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।

শিশু-কিশোরদের জন্য এটি হতে পারে শিক্ষামূলক ভ্রমণের চমৎকার সুযোগ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার পাশাপাশি বাস্তব সামরিক সরঞ্জাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাও পাওয়া যায় এখানে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রবেশমূল্য ১৫০ টাকা। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য প্রবেশ ফ্রি। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঈদের দিনগুলোতে জাদুঘর খোলা থাকে। সাধারণ সময়ে বুধবার ও সরকারি ছুটি ছাড়া শনিবার থেকে মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার খোলা থাকে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।

লালবাগ কেল্লা
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে লালবাগ কেল্লা অন্যতম। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র ও তৎকালীন বাংলার সুবাদার মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ সালে কেল্লাটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।

পরবর্তীতে শায়েস্তা খাঁ দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হলেও তাঁর কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর পর কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কেল্লাটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

দুর্গের ভেতরে রয়েছে পরীবিবির সমাধি, হাম্মামখানা, শাহী মসজিদ ও সুবেদারদের দরবার হল। বর্তমানে দরবার হলটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে মুঘল আমলের অস্ত্র, পোশাক ও তৈলচিত্র প্রদর্শিত হয়।

এছাড়া বিশাল বাগান, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও জলাশয় দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে। ঈদের ছুটিতে এখানে ঘুরতে এলে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদও নেওয়া যায়।

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা। প্রাথমিক শিক্ষার্থী ও পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য প্রবেশ ফ্রি। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঈদের দিনগুলোতে কেল্লা খোলা থাকে। সাধারণ সময়ে রবিবার পূর্ণ দিবস এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। অন্যান্য দিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা
মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি ভিড় হওয়া স্থানগুলোর একটি। বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফ, কুমির ও হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী দেখতে শিশুদের আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি।

পরিবার নিয়ে সারাদিন কাটানোর জন্য এটি উপযুক্ত স্থান। তবে অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে সকালেই প্রবেশ করার পরামর্শ দেন অনেক দর্শনার্থী।

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। তিন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২০ টাকা। প্রাণী জাদুঘরে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১০ টাকা দিতে হয়। বিভিন্ন রাইডের জন্য আলাদা টিকিট রয়েছে।

ঈদের দিনগুলোতে চিড়িয়াখানা খোলা থাকে। সাধারণ সময়ে সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতি রবিবার বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মকালে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শীতকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম বড় সংগ্রহশালা। এখানে মুক্তিযুদ্ধ, প্রত্নতত্ত্ব, লোকজ সংস্কৃতি, প্রাচীন মুদ্রা ও শিল্পকলার বিশাল সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে।

পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জ্ঞান বাড়ানোর জন্যও এটি উপযোগী স্থান।

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা। তিন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৩০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঈদের দিন জাতীয় জাদুঘর বন্ধ থাকে। তবে ঈদের পরের দুই দিন সাধারণত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

আহসান মঞ্জিল

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গোলাপি রঙের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা আহসান মঞ্জিল পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন। একসময় এটি ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের আবাসস্থল।

বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। নবাবদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, অলংকৃত রুপার সামগ্রী, তৈলচিত্র, নাচঘর ও অতিথিকক্ষসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা। ১২ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৩০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফ্রি। আগে থেকে আবেদন করলে শিক্ষার্থীরাও বিনামূল্যে পরিদর্শনের সুযোগ পান।

ঈদুল আজহার দিন আহসান মঞ্জিল বন্ধ থাকে। অন্য সময়ে শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার ও সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘর বন্ধ থাকে।

ঈদে খোলা থাকবে বিনোদন পার্ক

ঈদ উপলক্ষে ঢাকা ও আশপাশের বেশিরভাগ বিনোদন পার্ক খোলা রাখা হয়। দর্শনার্থীদের বাড়তি চাপ সামলাতে অনেক পার্ক বিশেষ আয়োজন, বাড়তি সময়সূচি ও ঈদ অফার চালু করে।

নন্দন পার্ক, ফ্যান্টাসি কিংডম, ড্রিম হলিডে পার্ক ও ফানল্যান্ড পার্ক ঈদের সময় দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। অনেক পার্ক রাত পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, শিশু পার্ক ও চন্দ্রিমা উদ্যানে ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়।

ঈদ ভ্রমণে কিছু সতর্কতা

ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে বের হওয়ার সময় কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ঈদের দিন বা পরদিন আংশিক বন্ধ থাকতে পারে। তাই কোথাও যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া ভালো।

শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন। অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলুন। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানীয় পানি রাখুন এবং নির্ধারিত পার্কিং ব্যবহার করুন। ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

এছাড়া টাকা-পয়সা ও ব্যাগ সতর্কতার সঙ্গে রাখুন এবং অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।

রাজধানীর ব্যস্ত জীবনের মাঝেও ঈদের ছুটি পরিবারকে সময় দেওয়ার বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস, প্রকৃতি ও বিনোদনের সমন্বয়ে ঢাকার এসব দর্শনীয় স্থান ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।