বান্দরবানের মারাইংতং পাহাড়ে মেঘের খেলা, মাতামুহুরী নদীর দৃশ্য এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনা। লামা ও আলীকদম উপজেলার সীমান্তবর্তী এই পর্যটনকেন্দ্রে রাত্রিযাপন ও রিসোর্টের সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ায় প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের আগ্রহও বাড়ছে। পর্যটকদের এই উপস্থিতি স্থানীয় ব্যবসায়ী, গাইড ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
রাত্রিযাপনের সুবিধায় বাড়ছে আগ্রহ
মারাইংতং পাহাড় দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতিপ্রেমী ও ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা, চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং ভোরের সূর্যোদয় দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসেন পর্যটকেরা।
সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ের চূড়া ও আশপাশে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা এবং রিসোর্টভিত্তিক সুবিধা চালু হওয়ায় পর্যটনকেন্দ্রটিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। আগে মূলত তরুণ ও ক্যাম্পিংপ্রেমীদের মধ্যে জনপ্রিয় থাকলেও এখন পরিবার নিয়েও অনেকে মারাইংতং ভ্রমণে যাচ্ছেন।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক আল ফারুক রাহাত বলেন, মারাইংতংয়ের সৌন্দর্যের কথা অনেক আগে থেকেই শুনেছেন তিনি। তবে পাহাড়ে রাত কাটানোর উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা থাকায় এবার পরিবার নিয়ে আসার সাহস পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আগের মতোই সুন্দর। থাকার ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা যুক্ত হওয়ায় সাধারণ পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ আগের তুলনায় আরামদায়ক হয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের প্রভাব
মারাইংতংয়ে পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য, গাইডের কাজ এবং যানবাহন পরিচালনার মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজহার হোসেন জানান, আগে মারাইংতংয়ে মূলত তরুণেরা ক্যাম্পিং করতে আসতেন। বর্তমানে রিসোর্ট ও রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা থাকায় সারা বছরই কমবেশি পর্যটকের দেখা মেলে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী, গাইড ও যানবাহন পরিচালকদের আয়ের সুযোগ বেড়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় গুরুত্ব
পর্যটনকেন্দ্রটির জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, মারাইংতং এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি জানান, পাহাড়ের সৌন্দর্য যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া গেলে মারাইংতং ভবিষ্যতে পার্বত্য বান্দরবানের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখতে পারে।
আশপাশের দর্শনীয় স্থান
মারাইংতং ভ্রমণের পাশাপাশি লামা উপজেলার মিরিঞ্জা ভ্যালি ও মারাইংছা হিল ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আলীকদম সদর থেকে আলীর সুড়ঙ্গ এবং পোয়ামুহুরী সড়কের প্রাকৃতিক দৃশ্যও ভ্রমণপথে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করতে পারে।
যেভাবে যাবেন মারাইংতং
ঢাকা বা দেশের অন্য প্রান্ত থেকে মারাইংতং যেতে প্রথমে কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাসে চড়ে চকরিয়া বাস টার্মিনালে নামতে হবে। সেখান থেকে জিপ, স্থানীয়ভাবে পরিচিত চান্দের গাড়ি অথবা লোকাল বাসে লামা কিংবা আলীকদমে যাওয়া যায়।
এরপর আলীকদম সড়কের মেম্বারপাড়া অথবা লামার সীমান্তবর্তী নির্ধারিত স্থান থেকে পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে পাহাড়ের চূড়া বা রিসোর্টে পৌঁছাতে হয়।
ভ্রমণের সময় উপযুক্ত জুতা, পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঙ্গে রাখা ভালো। যাত্রার আগে স্থানীয় পথনির্দেশনা, আবহাওয়া ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য জেনে নেওয়া উচিত। পাহাড়ের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং স্থানীয় নিয়ম মেনে চলাও প্রত্যেক পর্যটকের দায়িত্ব।