সিলেটের জাফলং মানেই পাহাড়, ঝরনা আর পিয়াইন নদীর মোহময় সৌন্দর্য। তবে এই পরিচিত ভ্রমণকেন্দ্র এখন পর্যটকদের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। জাফলংয়ের খাসিয়া পুঞ্জিতে চালু হয়েছে কমিউনিটি ট্যুরিজম, যেখানে পর্যটকেরা শুধু ঘুরতেই নয়, চাইলে খাসিয়া পরিবারের সঙ্গে রাতও কাটাতে পারবেন। কাছ থেকে জানতে পারবেন তাঁদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্যের গল্প।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর যৌথ উদ্যোগে গত বছরের জুলাই থেকে জাফলংয়ের কয়েকটি খাসিয়া পুঞ্জিতে এই কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে তিনটি পুঞ্জিতে চারটি হোমস্টে রয়েছে। সেখানে একসঙ্গে অন্তত ১৫ জন পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে।

জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাট থেকে শুরু হয় এই অভিজ্ঞতার যাত্রা। পিয়াইন নদ পার হয়ে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় খাসিয়া কমিউনিটি মিশনে। স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয়সংলগ্ন এলাকাতেই তৈরি হয়েছে একটি হোমস্টে। এখানকার গাইডদের বেশির ভাগই খাসিয়া তরুণ-তরুণী। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করছেন।

এরপর একে একে দেখা মেলে নকশিয়াপুঞ্জি ও লামাপুঞ্জির। খাসিয়া সম্প্রদায়ের ভাষায় একেকটি পাড়া বা মহল্লাকে বলা হয় পুঞ্জি। পথজুড়ে চোখে পড়ে সুপারি গাছ আর পানের বরজ। উঁচু মাচার ওপর নির্মিত ঘরগুলো যেন ছবির মতো সাজানো। কোথাও বাঁশের ঘর, কোথাও আধুনিক পাকা বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি ও উঠান পরিচ্ছন্নতায় আলাদা নজর কাড়ে।

স্থানীয় গাইড সেভেনলী খংস্তিয়ার ভাষ্য, খাসিয়াদের জীবনে পরিচ্ছন্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতীতে বন্য প্রাণীর আক্রমণ এড়াতে উঁচু মাচার ওপর ঘর নির্মাণ করা হতো। সময় বদলালেও সেই ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন তাঁরা।

নকশিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ওয়েলকাম লাম্বা জানান, শুরুতে কমিউনিটি ট্যুরিজম নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। পরে প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ধারণা বদলে যায়। নিজেদের বাড়ির অব্যবহৃত কক্ষ সংস্কার করেই তাঁরা হোমস্টে চালু করেছেন। এতে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এখন নিয়মিত এখানে আসছেন। এতে শুধু হোমস্টে মালিক নন, স্থানীয় গাইড, অটোরিকশাচালক ও দোকানিরাও উপকৃত হচ্ছেন।

খাসিয়া পুঞ্জির অন্যতম আকর্ষণ স্থানীয় খাবার। রমলা রেস্টুরেন্ট নামের একটি কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে পর্যটকেরা খেতে পারেন বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে বা চিকেন সালাদ, বাঁশকোঁড়ল, কাঁঠাল-শুঁটকির তরকারি, সরওয়া স্যুপ ও চিকেন ভুনাসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার। খাবারের খরচ জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।

ভ্রমণের অংশ হিসেবে পর্যটকেরা ঘুরে দেখতে পারেন জাফলং চা-বাগান, সাইকেল ট্র্যাকিং এলাকা ও লামাপুঞ্জির সেলফি জোন। সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় খাসিয়া শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে খাসিয়া ভাষার গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ দেয়।

এ ছাড়া রয়েছে একটি কমিউনিটি মিউজিয়াম। সেখানে খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত পুরোনো সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্রের আদলে তৈরি মিনিয়েচার প্রদর্শন করা হয়।

পরদিন সকালে পর্যটকেরা সরাসরি দেখতে পারেন পানচাষের কার্যক্রম। খাসিয়াদের কাছে পানপাতা পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। তাই প্রতিদিন সকালে গোসল শেষে পানচাষিরা বরজে কাজ করেন। পান ও সুপারি এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস হলেও এখন পর্যটনও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক কাবিল মিঞা জানান, কমিউনিটি ট্যুরিজম চালুর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে একাধিক কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন আরও অনেকে নিজেদের বাড়িতে হোমস্টে চালু করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তবে বর্তমানে এই রাতযাপনের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ভ্রমণের আগে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনুমতি নিতে হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবিষ্যতে জাফলংয়ের আরও খাসিয়া পুঞ্জিতে এই উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।