সময়ের স্রোত থেমে আছে যেন পাহাড়ের কোলে। জাপানের এক প্রাচীন হোটেল আজও বহন করে চলেছে ১,৩০০ বছরের ইতিহাস, যেখানে পা রাখলেই মনে হয় ফিরে গেছেন শত শত বছর আগের জাপানে। আধুনিকতার ভিড়ে নিজস্ব ঐতিহ্য অটুট রেখে এই হোটেল এখনো পর্যটকদের কাছে বিস্ময়ের এক অনন্য নাম।

জাপানের নিশিয়ামা অনসেন কেইউনকান বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো হোটেল হিসেবে স্বীকৃত। ২০১১ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এই স্বীকৃতি দেয়। ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই হোটেলটি টানা ৫২ প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের হাতে পরিচালিত হচ্ছে, যা বিশ্বে বিরল এক উদাহরণ।

ইয়ামানাশি প্রিফেকচারে দক্ষিণ জাপানি আল্পস পর্বতমালার কাছে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী রিওকানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। কাছেই রয়েছে মাউন্ট ফুজি, যা পুরো এলাকাকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে।

রিওকান হলো জাপানের ঐতিহ্যবাহী অতিথিশালা, যেখানে শুধু থাকার সুবিধাই নয়, বরং জাপানি সংস্কৃতির পূর্ণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। এখানে তাতামি ম্যাটের ঘর, ফুতন বিছানা, গরম পানির অনসেন এবং স্থানীয় খাবারের আয়োজন রয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই ধরনের আবাসন বিশেষ আকর্ষণীয়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই হোটেলে বিভিন্ন শ্রেণির অতিথি অবস্থান করেছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শোগুন শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এখানে এসেছেন। এমনকি বর্তমান জাপানি সম্রাট নারুহিতোও এই হোটেলে অবস্থান করেছেন বলে জানা যায়।

হোটেলটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক গরম পানির উৎস। হাকুহো স্প্রিংস থেকে সরাসরি পানি সরবরাহ করা হয়। এখানে রয়েছে মোট ৩৭টি কক্ষ এবং ৬টি হট স্প্রিং, যার মধ্যে ৪টি খোলা আকাশের নিচে এবং ২টি ঘরের ভেতরে।

জাপানের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ট্যাটুকে অনেক সময় অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত মনে করা হয়। তাই যাদের শরীরে ট্যাটু রয়েছে, তাদের জন্য এখানে আলাদা বুকিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে অন্য অতিথিদের অভিজ্ঞতায় প্রভাব না পড়ে।

দীর্ঘ ইতিহাসে এই হোটেল নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯০৯ ও ১৯১৬ সালে অগ্নিকাণ্ড, ১৯২৫ সালে পাথর দুর্ঘটনা এবং ১৯৮২ সালের টাইফুন উল্লেখযোগ্য। এমনকি মূল ভবনটি তিনবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।

তবে এত প্রতিকূলতার পরও হোটেলটি তার ঐতিহ্যবাহী রূপ অক্ষুণ্ন রেখেছে। আধুনিক সংস্কার বা বড় ধরনের সম্প্রসারণ না করে পুরোনো ধাঁচই বজায় রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় রয়েছে প্রকৃতির ছোঁয়া, স্থানীয় পাথরের মেঝে, কাঠের গোসলখানা এবং ঘরে ঘরে গাছপালার নকশা।

এই হোটেলে ২ থেকে ৭ জনের জন্য কক্ষ ভাড়া শুরু হয় প্রায় ৫২ হাজার ইয়েন থেকে। খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও, ইতিহাস আর সংস্কৃতির এমন অভিজ্ঞতা পেতে আগ্রহীদের কাছে এটি অমূল্য।

নিশিয়ামা অনসেন কেইউনকান শুধু একটি হোটেল নয়, এটি জীবন্ত ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে থাকা মানেই জাপানের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, আতিথেয়তা ও প্রকৃতির এক অসাধারণ মেলবন্ধন অনুভব করা।