ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়। এর এক সরু গলি আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। নাম তার ট্রেন স্ট্রিট। স্থানীয়দের ভাষায় ‘ফো দুয়োং তাও’। মাত্র ৪০০ মিটার দীর্ঘ এই রেলপথের দুই পাশে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ক্যাফে, রঙিন লণ্ঠন আর ঝুলন্ত আলোয় সাজানো দোকান। কিন্তু রোমাঞ্চকর এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রাণঘাতী ঝুঁকি।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে যখন ট্রেন গর্জন তুলে এই সরু পথ দিয়ে ছুটে যায়, পর্যটকেরা মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে একটি নিখুঁত সোশাল মিডিয়ার পোস্টের জন্য।
এই রেলপথের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯০২ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নির্মিত নর্থ সাউথ রেলওয়ে হ্যানয়কে হো চি মিন সিটির সঙ্গে যুক্ত করে। পরে রেলওয়ে কর্মীদের জন্য ট্র্যাকের পাশে ছোট ছোট বাড়ি নির্মিত হয়। সময়ের সঙ্গে এলাকাটি নিম্নবিত্ত পাড়ায় পরিণত হয়; ট্রেন চলাচলের সময় ঘর কাঁপত; মানুষ হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠত। তখন এটি ছিল একেবারেই সাধারণ আবাসিক এলাকা।
এতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে ২০১৩ সালে। ‘হ্যানয় অন দ্য ট্র্যাকস’ নামে একটি ট্যুর চালু করে ওই বছর হ্যানয়ভিত্তিক ফটোগ্রাফি সংস্থা ভিয়েতনাম ইন ফোকাস। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষত ইনস্টাগ্রামে ভিডিও শেয়ারিং জনপ্রিয় হয়।
২০১৪ সালে ‘টাফ ট্রেইন’ অনুষ্ঠানেও এই এলাকা দেখানো হয়। ধীরে ধীরে ট্রেন স্ট্রিট ভাইরাল হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে এক বাসিন্দা ট্র্যাকের পাশে কফি ও বিয়ার বিক্রি শুরু করলে অন্যরাও ব্যবসায় নামেন। ক্যাফে, বার আর সজ্জায় ভরে ওঠে সরু গলিটি।
আজ পর্যটকেরা ট্রেন আসার প্রায় ৩০ মিনিট আগে হাজির হন। দোকানিরা তাদের ট্র্যাকের পাশের আসনে বসান; ট্রেনের হুইসেল বাজতেই সবাই দেয়ালের সঙ্গে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। ট্রেন ছুটে গেলে টেবিল কেঁপে ওঠে, আর ক্যামেরায় ধরা পড়ে রোমাঞ্চের ছবি।
কিন্তু বিপদও ঘটে। ২০২৫ সালে এক পর্যটক সেলফি তুলতে গিয়ে প্রায় ট্রেনের নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। ফলে সরকার একাধিকবার এলাকা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে; পুলিশ ব্যারিকেড বসায়, ট্যুর অপারেটরদের সতর্ক করে। তবু কৌতূহলী মানুষের ভিড় থামে না।
অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এই উন্মাদনার মূল চালিকা শক্তি। হাজারো পোস্টে ট্যাগ হওয়া এই স্থান যেন ‘না দেখলে মিস’ হয়ে যাওয়ার ভয় তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ স্বভাবতই অন্যের অভিজ্ঞতা অনুকরণ করতে চায়—এটি সামাজিক প্রবৃত্তি। তার ওপর ঝুঁকির উপাদান রোমাঞ্চ বাড়ায়; নিয়ম-কানুনে অভ্যস্ত দেশ থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এটি একেবারেই অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।
তবে স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিমুখী। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নতি—পরিবারগুলোর আয় বেড়েছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। অনেকে শুধু ছবি তুলে চলে যায়, রেলপথের ঔপনিবেশিক ইতিহাস বা বাসিন্দাদের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা অজানাই থেকে যায়।
ট্রেন স্ট্রিট তাই এক বৈপরীত্যের প্রতীক; অর্থনীতি, রোমাঞ্চ ও সামাজিক মাধ্যমের শক্তির মিলিত ফল। এটি যেমন অনন্য অভিজ্ঞতা, তেমনি স্মরণ করিয়ে দেয় যে কারও দৈনন্দিন বাস্তবতা অন্যের কাছে কেবল একটি ছবি হতে পারে। আর সেই ছবির জন্য কখনও কখনও জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।