শ্রমসাধ্য এই পদটি সাম্রাজ্য, সীমানা আর বিশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে উদারতা ও আতিথেয়তার এক অভিন্ন ভাষায় পরিণত হয়েছে।

রিয়াদে নিজের বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী সৌদি উৎসবের খাবারের আয়োজন করলে ফাতিমা অলিয়ান প্রায়ই মেনুতে রাখেন ওয়ারাক এনাব—আঙুরপাতায় মোড়ানো ভর্তা, যা দোলমা নামেও পরিচিত। যত্ন করে রোল করা পাতার ভেতরে থাকে মসলা মেশানো ভাত, মাংস ও সবজি; ওপরে ছিটানো থাকে লেবুর রস। বড় থালায় সাজিয়ে পরিবেশন করা হয় এই পদ।

অলিয়ান বলেন, “আমি বাড়িতে দোলমা বানাতে ভালোবাসি। আমাদের পরিবারে বহুদিন ধরেই এটি তৈরি হয়। উৎসবের প্লেটে এটি ছাড়া আমি কিছুই কল্পনা করতে পারি না।” তাঁর কাছে দোলমা শুধু খাবার নয়; এটি ভালোবাসা, একসঙ্গে থাকা আর অতিথিপরায়ণতার প্রতীক।

মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় বসবাসের অভিজ্ঞতায় লেখকও আঙুরপাতার টকস্বাদ দোলমার প্রেমে পড়েছেন—বিশেষ করে রমজানে, যখন সূর্যাস্তের পর শহরের খাবারের জগৎ প্রাণ ফিরে পায়। ইফতারে একেক বাড়ি ও রেস্তোরাঁয় ডলমার স্বাদ একেক রকম—কখনো ঝাল, কখনো টক, কখনো সম্পূর্ণ নিরামিষ।

দোলমার বৈশ্বিক ইতিহাস

‘দোলমা’ শব্দটি তুর্কি ক্রিয়া dolmak থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ভরাট করা’। আগে সেদ্ধ করা পাতা দিয়ে মোড়ানো বা ফাঁপা করা ফল-সবজির ভেতরে ভাত, মাংস, সবজি ও মসলা ভরে রান্না বা পরিবেশন করাই দোলমা। ধারণা করা হয়, ১৫শ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রান্নাঘরে এর সূচনা।

খাদ্য-ইতিহাসবিদ প্রিসিলা মেরি ইশিনের মতে, ১৫ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে উসমানীয়রা ভরাট খাবারে বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠে—ভেড়া, পাখি, মাছ থেকে শুরু করে পেঁয়াজ, আপেল, আঙুরপাতা—সবই ভরাট করে রান্না হতো।

ধর্মীয় অনুশীলনও এতে প্রভাব ফেলেছিল। সাম্রাজ্যে বিপুল বাইজেন্টাইন খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় উপবাস করতেন এবং প্রাণিজ খাদ্য এড়িয়ে চলতেন। ফলে নিরামিষ ভরাট পাতা ও সবজির পদ জনপ্রিয় হয়। একই সঙ্গে রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে সুলতানকে খুশি করতে রাঁধুনিদের প্রতিযোগিতা নতুন নতুন দোলমা তৈরিতে উৎসাহ দেয়।

১৭শ শতকে দোলমা হয়ে ওঠে মর্যাদার প্রতীক। ধনী ব্যক্তিরা আলাদা ‘দোলমা রাঁধুনি’ নিয়োগ করতেন; ইস্তাম্বুলে বিশেষ দোলমা রেস্তোরাঁও গড়ে ওঠে। ভাত ছিল বিলাসী উপাদান, তাই পিলাফ ও দোলমা উৎসব ও রমজানের খাবারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

ভৌগোলিক বিস্তার

১৮ থেকে ২০ শতকে সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে দোলমা ছড়িয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগর, ককেশাস, বলকান, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। আঙুরপাতার দোলমা গালফে ওয়ারাক এনাব, কুর্দিস্তানে ইয়াপরাখ, আজারবাইজানে ইয়ারপাক দোলমাসি, গ্রিসে ডলমাডেস নামে পরিচিত। লেভান্ট ও মিশরে ভরাট সবজি মাহশি নামে জনপ্রিয়। ঠান্ডা অঞ্চলে বাঁধাকপি দিয়ে তৈরি হয় পোল্যান্ডের গোয়াবকি ও বুলগেরিয়ার সার্মি।

সুইডেনে এটি পৌঁছায় রাজা চার্লস দ্বাদশের মাধ্যমে, যিনি উসমানীয় ভূখণ্ডে নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে কোলদোলমার জনপ্রিয় করেন। ভারতে আর্মেনীয় বণিকদের হাত ধরে আসে ভরাট সবজির ধারণা; বাংলায় তা রূপ নেয় মাছ, চিংড়ি, আলু বা ছানাভরা সুস্বাদু পটোলের দোলমাতে।

উৎসব ও স্মৃতির পদ

বিশ্বজুড়ে দোলমা উৎসবের খাবার—রমজানের ইফতার, বড়দিন, নববর্ষ, নওরোজ বা দুর্গাপূজায়। এর শ্রমসাধ্য প্রস্তুতিই একে বিশেষ করে তোলে। পরিবার-পরিজন মিলে পাতা প্রস্তুত, পুর বানানো ও রোল করার যে ঐতিহ্য, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে; আজারবাইজানে এই সম্মিলিত দোলমা-প্রস্তুত প্রথা ইউনেসকোর স্বীকৃতিও পেয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে দোলমা আজও মানুষকে একত্র করে। ইফতার হোক, বড়দিনের ভোজ হোক বা পারিবারিক পুনর্মিলনী—এক প্লেট দোলমা যেন একই বার্তা দেয়: আপনি স্বাগত, আপনি প্রিয়।