মানুষ কি কখনো পৃথিবীর কাছের কোনো এক্সোপ্ল্যানেটে (সৌরজগতের বাইরের গ্রহ) পৌঁছাতে পারবে? কল্পকাহিনী বা চলচ্চিত্র নয়, বাস্তবে কি এটা সম্ভব?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাস্তবতার বিচারে মানবজাতির প্রথম নক্ষত্রান্তর যাত্রার সবচেয়ে সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে ‘প্রক্সিমা সেন্টোরি’। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪.২ আলোকবর্ষ। এই নক্ষত্রমণ্ডলেই রয়েছে পৃথিবীর নিকটতম এক্সোপ্ল্যানেট 'প্রক্সিমা বি'। তবে এই নিকটতম স্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেই সহজ বা সংক্ষিপ্ত নয়।

প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে?

সাবেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী অশোক কুমার জানান, ২০০৬ সালে উৎক্ষেপণ করা ‘নিউ হরাইজন্স’ মহাকাশযানের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল সেকেন্ডে প্রায় ১৬ কিলোমিটার (৯.৯৪ মাইল)। এই গতিতে ভ্রমণ করলেও প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৮০ হাজার বছর।

তিনি আরও জানান, গত ২০ বছরে প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন হলেও রকেটে রাসায়নিক জ্বালানি এবং বর্তমানে পাওয়া সেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পৌঁছাতে অন্তত ১৭ হাজার বছর ভ্রমণ করতে হবে।

এই দীর্ঘ যাত্রার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী নন এই বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, "এই পরিমাণ ভ্রমণের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হবে, তার ভর হবে আমাদের পুরো গ্যালাক্সির ভরের সমান—যা স্পষ্টতই এক অসম্ভব বিষয়।"

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সম্ভাবনা

অবশ্য নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই দীর্ঘ সময়কে  কমিয়ে আনা সম্ভব। আলোর গতির সমান বা তার চেয়ে বেশি গতিতে চলার পদ্ধতি আবিষ্কার না হলেও কেমিক্যাল ফুয়েল, ইউরেনিয়াম কিংবা অ্যান্টিম্যাটারের মতো জ্বালানি এবং ‘সোলার সেইল’-এর মতো নতুন চালিকাশক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব উঠেছে।

মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) লেজারের ধাক্কায় চালিত ছোট ছোট একঝাঁক রোবোটিক প্রোব প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পাঠানোর পরিকল্পনা চিন্তা করছে, যা প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সেখানে পৌঁছে যাবে। তবে এগুলো অবশ্যই হবে মানবহীন।

অন্য বিজ্ঞানীরা অবশ্য মহাকাশে দীর্ঘযাত্রায় মানুষকে জীবিত ও সুস্থ রাখার বিষয়টিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

এর একটি সমাধান হতে পারে ‘জেনারেটর শিপ’ বা প্রজন্মভিত্তিক মহাকাশযান। রবার্ট এইচ গোডার্ডের প্রাথমিক ধারণা এবং ১৯৮০-এর দশকের ‘ওয়ার্ল্ড শিপস’ থেকে আসা এই স্বয়ংসম্পূর্ণ যানগুলোতে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মানুষ যাত্রা করতে পারবে।

গত বছর ‘প্রোজেক্ট হাইপেরিয়ন’ নামের এক প্রতিযোগিতায় নতুন ধরনের মহাকাশযানের বেশ কিছু নকশা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে প্রথম স্থান পাওয়া 'ক্রিসালিস' (Chrysalis) নামের যানটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩৬ মাইল। এটি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপযোগী করে তৈরি। তাত্ত্বিক নিউক্লিয়ার ফিউশন রিয়্যাক্টর ব্যবহার করে মাত্র ৪০০ বছরের মধ্যে এটি ২,৪০০ জন মানুষকে আলফা সেন্টোরিতে নিয়ে যেতে পারবে।

ক্রিসালিস দলের সদস্যরা এক বার্তায় জানান, "সবচেয়ে কঠিন কিন্তু আকর্ষণীয় বিষয় ছিল এটি নিয়ে ভাবা যে, বহু প্রজন্ম ধরে মহাকাশযানে যাত্রীরা কীভাবে বাস করবে এবং তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করবে।"

দূরপাল্লার অভিযানে মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

শুধু ইঞ্জিনের সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না, যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখাও এক জটিল চ্যালেঞ্জ।

স্ট্রাসবার্গ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ফ্রেডেরিক মারিন বলেন, "নক্ষত্রমণ্ডলগুলোর মাঝখানের শূন্য স্থানে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হলে খাদ্যের সংস্থান নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। অক্সিজেন ও বিভিন্ন গ্যাস পুনর্ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেদের উৎপাদন করতে হবে।"

এর বাইরে মহাকাশযানের ভেতরে কৃত্রিম অভিকর্ষ তৈরি করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, "মহাকাশ এক চরম প্রতিকূল পরিবেশ, যেখানে টিকে থাকা কঠিন।"

তবে আরেকটি পথ হতে পারে যাত্রীদের সুপ্তাবস্থায় (Hibernation বা Cryosleep) রেখে ভ্রমণ করানো, যেমনটি দেখা যায় কল্পকাহিনিগুলোতে। ২০২৬ সালের এক গবেষণায় গবেষকরা জানান, অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় জমিয়ে রাখা ইঁদুরের মস্তিষ্কের টিস্যু আবার সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়নে এখনও বহু পথ বাকি।

নক্ষত্রান্তর যাত্রার নৈতিক দিক

ফ্রেডেরিক মারিন ও তাঁর দলের হিসাব অনুযায়ী, বংশবৃদ্ধিধারা সচল রেখে এই যাত্রা নিশ্চিত করতে মহাকাশযানে অন্তত ১০০ জন মানুষ থাকতে হবে। তবে এতে তৈরি হয় নতুন নৈতিক প্রশ্ন।

এই যানের বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হবে। শুধু বংশের বৈচিত্র্য ও সুস্থ প্রজন্ম ধরে রাখতে নারীদের নির্দিষ্ট নিয়মে সন্তান ধারণ করতে হতে পারে, যা মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় বড় হস্তক্ষেপ।

এর বাইরে আর্থিক দিকটি হিসাব করলেও দেখা যায়, এ ধরনের যান তৈরিতে কোটি কোটি (ট্রিলায়ন) ডলার খরচের প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানী অশোক কুমার মনে করেন, রাসায়নিক জ্বালানির বিশাল চাহিদার কারণে আপাতত সুদূর ভবিষ্যতে নক্ষত্রান্তর যাত্রা কেবল কল্পকাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তবে গবেষক ফ্রেডেরিক মারিন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আজকের অসম্ভব বিষয়টি ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে। চাঁদে নতুন ঘাঁটি বা মহাশূন্য শিল্প তৈরি হলে আগামী কয়েকশ বছরের মধ্যে ভিন্ন গ্রহে ভ্রমণের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

সূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন