হিমালয়ের দুর্গম উচ্চতায় অবস্থিত রূপকুণ্ড হ্রদ প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রাচীন মানবকঙ্কাল ও অমীমাংসিত ইতিহাসের জন্য পরিচিত। তবে প্রায় পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতার এই হ্রদে পৌঁছাতে প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞ গাইড।
ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ত্রিশূল পর্বতের কাছে অবস্থিত রূপকুণ্ড হ্রদ পরিচিত ‘কঙ্কালের হ্রদ’ নামে। হ্রদ ও আশপাশে ছড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের কঙ্কাল দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও অভিযাত্রীদের কৌতূহলের বিষয়। বরফ গলে গেলে হ্রদের আশপাশে এসব দেহাবশেষ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কঙ্কালের হ্রদ ঘিরে রহস্য
১৯৪২ সালে এক ব্রিটিশ বনরক্ষী রূপকুণ্ডে মানুষের কঙ্কালের সন্ধান পান। এরপর কঙ্কালগুলোর পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা তত্ত্ব সামনে আসে। কোনো কোনো ধারণায় রাজপরিবারের সদস্য ও তাঁদের সঙ্গীদের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আবার মহামারি কিংবা সামরিক অভিযানের সঙ্গে এসব দেহাবশেষের সম্পর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় রহস্যের নতুন দিক উঠে আসে। গবেষণায় দেখা যায়, কঙ্কালগুলো জিনগতভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের এবং তাঁদের মৃত্যুর সময়ের মধ্যে প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে। কিছু দেহাবশেষের বয়স আনুমানিক ১২০০ বছর। ফলে সবাই একই সময়ে কোনো একটি ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন, এমন ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
কোথায় রূপকুণ্ড, কীভাবে যাবেন
উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় অবস্থিত এই হ্রদ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার মিটার উঁচুতে। সাধারণত লোহাজুং এলাকা থেকে ট্রেকিং শুরু করা হয়। সেখান থেকে বন, পাথুরে পাহাড়ি পথ, বরফাচ্ছন্ন ঢাল এবং আলি ও বেদনি বুগিয়াল নামে পরিচিত বিস্তীর্ণ পাহাড়ি তৃণভূমি পেরিয়ে হ্রদের দিকে এগোতে হয়।
পুরো ট্রেকের দূরত্ব প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ কিলোমিটার। যাত্রাপথ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে সাধারণত ছয় থেকে আট দিন সময় হাতে রাখা ভালো। পথে ত্রিশূল, নন্দা ঘুন্টি ও আশপাশের হিমালয় পর্বতশৃঙ্গের দৃশ্য দেখা যায়।
কতটা কঠিন এই ট্রেক
রূপকুণ্ড ট্রেক মাঝারি থেকে কঠিন পর্যায়ের হলেও উচ্চতার কারণে এটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শেষ পর্যায়ের খাড়া, পাথুরে ও বরফাচ্ছন্ন পথ পাড়ি দিতে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা এড়াতে ধাপে ধাপে উচ্চতায় ওঠা এবং শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া জরুরি।
যাত্রার আগে নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক অনুশীলন করুন। সঙ্গে রাখুন উপযুক্ত ট্রেকিং জুতা, গরম পোশাক, বৃষ্টিরোধী আবরণ, পানির বোতল ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম। মাথাব্যথা, বমিভাব বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত নিচু উচ্চতায় নেমে চিকিৎসা সহায়তা নিন।
কখন যাবেন
মে থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের সময় রূপকুণ্ড ট্রেকের পরিকল্পনা করা হয়। তবে তুষারপাত, বৃষ্টি ও স্থানীয় আবহাওয়ার কারণে যাত্রার উপযুক্ত সময় বদলে যেতে পারে। জুলাইয়ে তৃণভূমি সবুজ থাকলেও বর্ষার বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৬ সালে ট্রেকের অনুমতি, সংরক্ষিত তৃণভূমিতে রাতযাপন এবং স্থানীয় বন বিভাগের নিয়ম সম্পর্কে যাত্রার আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা জরুরি। নিবন্ধিত ট্রেক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নিন। পথে পাওয়া কঙ্কাল বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্পর্শ কিংবা সরানোর চেষ্টা করবেন না। প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে এনে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও অভিযানের সমন্বয়ে রূপকুণ্ড হিমালয়ের অন্যতম আলোচিত গন্তব্য। তবে এর দুর্গমতা ও উচ্চতার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি এবং অনুমতি নিশ্চিত করেই যাত্রা করা উচিত।