দেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত আড়াই মাসে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অগ্নিকাণ্ড, পানিতে ডুবে মৃত্যু, সড়ক দুর্ঘটনা ও প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের প্রাণ গেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের একটি রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু এবং সমুদ্রে ডুবে পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাহাড়ি পর্যটন এলাকায় অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনায়ও ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো পর্যটক।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ নামের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ ১০ পর্যটক মারা যান। এ ঘটনার পর হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কক্সবাজার জেলায় দুই হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে ছয় শতাধিক স্থাপনা অনুমোদনহীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১১৫টি হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের।
নিহত ফারিহা কবিরের বাবা জিয়াদুল কবির বলেন, ‘সরকারের যেসব বিভাগ ও দপ্তরের পর্যটন এলাকার অনিয়ম ও ঝুঁকি দেখার কথা, তারা সেগুলো দেখছে না। তাই মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। অবৈধ রিসোর্ট হচ্ছে, পর্যটন এলাকায় ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ চান্দের গাড়িও চলছে।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানান, অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আরও স্থাপনা পরিদর্শন করে তালিকা করা হবে।
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পরদিন থেকে কক্সবাজারে ঘুরতে যাওয়া কয়েকজন পর্যটক সমুদ্রে গোসল করতে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হন। হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় সাগরে ডুবে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী ছিলেন।
এদিকে সাজেকে অবরোধের ঘোষণার পর প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্যে অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। ফলে ভ্রমণে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন পর্যটকেরা।
সড়ক দুর্ঘটনাও প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠেছে। গত ৫ অক্টোবর বান্দরবানের থানচির তিন্দুতে পর্যটকবাহী একটি চাঁদের গাড়ি খাদে পড়ে দুজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। ২৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে একই ধরনের গাড়ির দুর্ঘটনায় একজন মারা যান। এর আগে ২৪ আগস্ট সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারান এক পর্যটক।
এ ছাড়া ১ আগস্ট কক্সবাজারের দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় মারা যান। পরে অনিরাপদ প্যারাসেইলিং নিষিদ্ধ করা হয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে পৃথক ঘটনায় তিনজন এবং সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর ও সিলেটের সাদাপাথরে পানিতে ডুবে আরও দুজন মারা যান।
ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হোসাইন বলেন, পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। তাঁর দাবি, নিরাপত্তাব্যবস্থায় পুলিশের ঘাটতি নেই। পর্যটকদের অসচেতনতা ও সতর্কবার্তা অমান্য করার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।
তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, দুর্বল উদ্ধারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক অনিয়ম প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ সেভিং সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।