চেনা পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে নদী, বন আর ইতিহাসের সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গের মঙ্গলগঞ্জ হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। ইছামতী নদীর তীরের এই জনপদে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের পুরোনো নীলকুঠি, নৌবিহারের সুযোগ এবং কাছেই পারমাদান অভয়ারণ্য। ইতিহাসের সঙ্গে স্থানীয় লোককথার মিশেল জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
কলকাতা থেকে সড়কপথে কয়েক ঘণ্টার যাত্রায় পৌঁছানো যায় মঙ্গলগঞ্জে। শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এখানে দেখা মেলে গ্রামীণ রাস্তা, সবুজ মাঠ ও নদীর শান্ত পরিবেশের। শরৎকালে কাশফুলের সমারোহ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
নীলকুঠিতে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ছাপ
মঙ্গলগঞ্জের অন্যতম দর্শনীয় স্থান পুরোনো নীলকুঠি, যা স্থানীয়ভাবে ‘কাটা সাহেবের কুঠি’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নীলচাষকে কেন্দ্র করে কৃষকদের ওপর শোষণ ও নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। পরিত্যক্ত এই স্থাপনাটি সেই সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
কুঠিটির বেশির ভাগ অংশ জরাজীর্ণ। পুরোনো ইটের দেয়াল, খিলান ও ক্ষয়প্রাপ্ত স্থাপত্য ইতিহাসে আগ্রহী ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করে।
‘কাটা সাহেব’কে ঘিরে লোককথা
নীলকুঠিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা ভৌতিক গল্প। লোককথা অনুযায়ী, নীলবিদ্রোহের সময় এক অত্যাচারী নীলকর সাহেবের মৃত্যু হয়েছিল এই এলাকায়। সেই কাহিনি থেকেই ‘কাটা সাহেব’কে ঘিরে রহস্যের জন্ম। রাতে কুঠির আশপাশে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার দাবিও শোনা যায়।
তবে এসব কাহিনির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এগুলো স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতির অংশ। ইতিহাস, স্থাপত্য ও লোকসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী পর্যটকেরা দিনের আলোয় কুঠিটি ঘুরে দেখতে পারেন।
ইছামতীতে নৌবিহার, কাছেই অভয়ারণ্য
মঙ্গলগঞ্জ ভ্রমণে ইছামতী নদীতে নৌবিহার হতে পারে অন্যতম আকর্ষণ। বিকেলের শেষভাগে নৌকায় নদী ঘুরে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা উপভোগ্য। নদীর আশপাশের গ্রামীণ জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশও ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
কাছেই রয়েছে পারমাদান অভয়ারণ্য, যা বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নামেও পরিচিত। সবুজ বনাঞ্চলে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে বন্যপ্রাণী দেখার নিশ্চয়তা নেই। অভয়ারণ্যে প্রবেশের আগে অনুমতি, প্রবেশের সময়সূচি ও স্থানীয় বিধিনিষেধ জেনে নেওয়া উচিত।
রাতের ভ্রমণে সতর্কতা জরুরি
নীলকুঠির ইতিহাস ও স্থানীয় লোককথা ঘিরে রাতের পরিবেশ অনেকের কাছে রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে। তবে নির্জন বা জরাজীর্ণ স্থাপনায় রাতে একা যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া, নির্ধারিত পথ অনুসরণ করা এবং অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ না করাই নিরাপদ।
নদী, বন, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও লোককথা, সব মিলিয়ে মঙ্গলগঞ্জ হতে পারে পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে এক ভিন্নধর্মী ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। যাওয়ার আগে যাতায়াত, নৌবিহার ও অভয়ারণ্যের বর্তমান নিয়মকানুন যাচাই করে নিলে ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হবে।মঙ্গলগঞ্জের নীলকুঠি ও কাটা সাহেবের প্রচলিত ভৌতিক কাহিনি