যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, দূরে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, বাতাসে ঘূর্ণায়মান বায়ুকল আর বিকেলের নদীপাড়ের প্রাণবন্ত পরিবেশ। সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জের চায়না বাঁধ এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত এই অবকাঠামো সময়ের সঙ্গে পরিচিতি পেয়েছে অবকাশ যাপন ও প্রকৃতি উপভোগের স্থান হিসেবে।
নদীভাঙন রোধের উদ্যোগ থেকে পর্যটন আকর্ষণ
যমুনার ভাঙনে একসময় সিরাজগঞ্জ শহরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। শহর রক্ষায় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ব্রিটিশ কারিগরি সহায়তায় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানির মাধ্যমে মূল শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে আরও উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি প্রায় ৮০ থেকে ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রসবার-৩ নির্মাণ করে। ১ হাজার ৭৮২ মিটার দীর্ঘ এই নদীশাসন অবকাঠামোটি স্থানীয়ভাবে ‘চায়না বাঁধ’ নামে পরিচিত। নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।
যমুনার জলরাশি ও সেতুর দৃশ্য
চায়না বাঁধে দাঁড়িয়ে একদিকে দেখা যায় যমুনার বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে দূরে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু। বিকেলের আলোয় নদীর পানিতে সূর্যের প্রতিফলন এবং সেতুর দৃশ্য উপভোগ করতে এখানে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। নদীর পাড়ে সময় কাটানো, ছবি তোলা ও খোলা বাতাসে অবসর যাপন এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।
স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘মিনি কক্সবাজার’ নামেও পরিচিত। তবে এটি সমুদ্রসৈকত নয়, যমুনার তীরবর্তী একটি নদীশাসন বাঁধ।
বায়ুকল ও ঋতুভেদে প্রকৃতির রূপ
চায়না বাঁধের আশপাশে স্থাপিত বায়ুকলগুলো দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ জোগায়। ঘূর্ণায়মান পাখার সঙ্গে নদী ও খোলা আকাশের দৃশ্য আলাদা পরিবেশ তৈরি করে।
বর্ষায় যমুনার পানি বেড়ে চারপাশ জলমগ্ন হয়ে ওঠে। বর্ষা শেষে নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচর ও কাশফুল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যোগ করে নতুন মাত্রা। ঋতুভেদে নদীর এই পরিবর্তিত রূপ দেখতে ভ্রমণপ্রেমীরা এখানে আসেন।
নৌভ্রমণ, খাবার ও সন্ধ্যার পরিবেশ
বাঁধের শেষ প্রান্তে স্থানীয় নৌকা ও স্পিডবোটের দেখা মেলে। নৌভ্রমণের সুযোগ থাকলেও যাত্রার আগে ভাড়া, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি জেনে নেওয়া ভালো।
বিকেল থেকে বাঁধের আশপাশে চা, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি ও অন্যান্য হালকা খাবারের দোকান বসে। কাছের হার্ট ভিউ পয়েন্ট থেকে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দেখা যায়। সন্ধ্যায় সেতুর আলো ও নদীর পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
ভ্রমণে যাওয়ার আগে
চায়না বাঁধ ঘুরতে বিকেল বেছে নিতে পারেন। তবে বর্ষায় নদীর স্রোত ও পানির উচ্চতা, পিচ্ছিল পাথর এবং নৌযাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। নদীর কিনারায় অসতর্কভাবে হাঁটা বা অনুমোদনহীন নৌযানে ওঠা এড়িয়ে চলুন। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।
নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত চায়না বাঁধ আজ সিরাজগঞ্জের পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। যমুনার প্রকৃতি, সেতুর দৃশ্য এবং নদীপাড়ের স্থানীয় জীবন কাছ থেকে দেখতে চাইলে জায়গাটি হতে পারে এক দিনের ভ্রমণের উপযোগী গন্তব্য।