প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শাল-গজারি বন, বন্য প্রাণীর বিচরণ এবং সবুজ ধানক্ষেতের জন্য পরিচিত ময়মনসিংহের কাদিগড় জাতীয় উদ্যান। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অব্যবস্থাপনার কারণে আকর্ষণ হারাচ্ছে। ভাঙাচোরা বিনোদনসামগ্রী, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাচিনা ইউনিয়নে অবস্থিত কাদিগড় জাতীয় উদ্যান। ভাওয়াল গড় ও মধুপুরের গড়ের মতো এখানেও রয়েছে শাল ও গজারি গাছের বন। পাশাপাশি আছে মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, গুল্ম ও বেত। বনাঞ্চলে হনুমান, বানর, শেয়াল, সজারু, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, বাগডাশ ও বেজিসহ বিভিন্ন প্রাণীর দেখা মেলে। রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী।
উদ্যানের ভেতরের কিছু ফাঁকা জায়গায় স্থানীয় কৃষকেরা ধান চাষ করেন। বনের সবুজের মাঝে ধানক্ষেতের দৃশ্য দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ জোগায়। উদ্যানের ওয়াচ টাওয়ার থেকে আশপাশের দৃশ্য দেখা যায়। ধান পাকার মৌসুমে খাবারের সন্ধানে বানর ও শেয়ালের আনাগোনাও চোখে পড়ে। একই সঙ্গে বনাঞ্চলটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যানের প্রধান ফটক খোলা থাকলেও সেখানে দায়িত্ব পালনকারী কাউকে দেখা যায়নি। নেই টিকিট কাউন্টার বা সুশৃঙ্খল প্রবেশব্যবস্থা। শিশুদের খেলাধুলার সরঞ্জামগুলোর বেহাল অবস্থা। বসার বেঞ্চগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
উদ্যানের একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারের আশপাশে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। টাওয়ারের সিঁড়িতেও প্রাণীর বিষ্ঠা দেখা গেছে। এসব কারণে দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশটি যেমন অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে, তেমনি পর্যটনকেন্দ্রটির সৌন্দর্যও ব্যাহত হচ্ছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
উদ্যানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী ও আনসার সদস্যের উপস্থিতি না থাকা এবং নিয়মিত পুলিশি টহলের অভাবের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিকেলের পর নির্জন স্থানে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানের ভেতরে কিশোর ও তরুণদের মাদকসেবন এবং অনিয়ন্ত্রিত আড্ডার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ভীতি ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে এসেও অনেকে বেশিক্ষণ অবস্থান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না।
পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ার দাবি
কাদিগড় জাতীয় উদ্যানকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সীমানাপ্রাচীর সংস্কার, অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন, প্রবেশপথে দায়িত্বশীল কর্মী নিয়োগ এবং টিকিট কাউন্টার চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনোদনসামগ্রী ও বেঞ্চ মেরামত, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, নিয়মিত পুলিশি টহল এবং মাদকসেবন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। যথাযথ তদারকি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আরও নিরাপদ ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা বা ময়মনসিংহ থেকে বাসে ভালুকার সিডস্টোর বাজার বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে সিডস্টোর-সখিপুর সড়ক ধরে অটো বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় কাচিনা পৌঁছানো যায়। এরপর স্থানীয় যানবাহনে পালগাঁও চৌরাস্তায় গিয়ে উদ্যানের প্রধান প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো সম্ভব। সেখান থেকে ভ্যানেও যাওয়া যায়, চাইলে হেঁটেও প্রবেশ করা যায়। যাত্রার আগে স্থানীয়ভাবে যানবাহন ও প্রবেশব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা জেনে নেওয়া ভালো।