পশ্চিম আফ্রিকায় একসময় মানচিত্রে দেখা যেত বিশাল এক পর্বতমালা— মাউন্টেনস অব কং। ধারণা করা হতো, এ পর্বতমালার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় প্রায় আড়াই হাজার মাইল। 
আধুনিক গিনি, কোত দিভোয়ার, বুরকিনা ফাসো ও নাইজেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাহাড়শ্রেণিকে মনে করা হতো আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ বিশাল প্রাকৃতিক দেয়াল।
কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই— এ পর্বতমালা বাস্তবে কখনোই ছিল না।
ফার আউট সাময়িকী লিখেছে, গল্পটির সূত্রপাত ১৭৯৮ সালে। স্কটিশ অভিযাত্রী মুনগো পার্ক পশ্চিম আফ্রিকা ভ্রমণের বিবরণ প্রকাশ করেন। তিনি নাইজার নদী ও আশপাশের অঞ্চল সম্পর্কে লিখেছিলেন, যা তখন পর্যন্ত ইউরোপের মানুষজনের কাছে প্রায় অজানাই ছিল।
পার্কের তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক দশক পর পশ্চিম আফ্রিকার একটি মানচিত্র তৈরি করেন ইংরেজ মানচিত্রবিদ জেমস রেনেল। সেখানেই প্রথমবারের মতো ‘মাউন্টেনস অব কং’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। রেনেল নাইজার নদীর গতিপথ সম্পর্কে নিজের ধারণার সঙ্গে তথ্যগুলো মেলাতে গিয়ে পাহাড়গুলোর অবস্থান ও বিস্তৃতি পরিবর্তন করেন। এভাবেই কাল্পনিক পর্বতমালাটি একটি প্রভাবশালী মানচিত্রে জায়গা করে নেয়।
এরপর শুরু হয় ভুল তথ্যের বিস্ময়কর বিস্তার। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক মানচিত্রকার নিজে সেখানে যাননি। ফলে তারা আগের মানচিত্রের ওপর নির্ভর করতেন। এক মানচিত্র থেকে আরেকটিতে তথ্য কপি হতে হতে পাহাড়গুলো আরও দীর্ঘ ও উঁচু হয়ে ওঠে। মানচিত্রে যোগ হয় নদী, পাহাড়ি পথ ও বসতি।
১৮০২ সালের অ্যারন অ্যারোস্মিথের আফ্রিকা অ্যাটলাসেও এ পর্বতমালা ছিল। ১৮০৫ সালে জন ক্যারির মানচিত্রে এটি পশ্চিম থেকে পূর্বে বিস্তৃত হয়ে প্রায় পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে আড়াআড়িভাবে বিভক্ত করেছে বলে দেখানো হয়। এমনকি ১৮৩৩ সালের ‘জিওগ্রাফি’ গ্রন্থেও এটিকে আফ্রিকার আটটি প্রধান পর্বতশ্রেণির একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এর পেছনে আরেকটি বাস্তবতা ছিল, যা ভুল ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল। কং নামে একটি শহর সত্যিই ছিল এবং তখন এটি আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ফলে শহরটির নামের সঙ্গে কাল্পনিক পাহাড়ের যোগসূত্রও অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল।
অবশেষে ১৮৮৮ সালে ফরাসি অভিযাত্রী লুই-গুস্তাভ বিংগার নাইজার নদী জরিপ করতে কং শহরে পৌঁছান। সেখানে তিনি একটি ব্যস্ত বাণিজ্যনগর, বাজার ও মসজিদ দেখতে পেলেও বিশাল কোনো পাহাড় দেখতে পাননি।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে মানচিত্রে থাকার পর ধীরে ধীরে মাউন্টেনস অব কং মানচিত্র থেকে মুছে যায়।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—পুরোনো মানচিত্র সবসময় বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি নয়। কখনো কখনো সেগুলো সত্য, অনুমান, ভুল বোঝাবুঝি ও অন্যের তথ্য কপি করার সমন্বয়ে তৈরি একটি গল্পও হতে পারে।