দিনের আলোয় স্বাভাবিক নীল সমুদ্র। কিন্তু রাত নামতেই ঢেউয়ের গায়ে দেখা যায় নীলচে আলোর ঝিলিক। অন্ধকার পানিতে ঢেউয়ের নড়াচড়া কিংবা পায়ের স্পর্শে জ্বলে ওঠা এই আলোকে দূর থেকে মনে হতে পারে, সমুদ্রের ভেতর যেন ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা। প্রকৃতির এই বিরল দৃশ্যই পরিচিত বায়োলুমিনেসেন্স বা জৈব-আলোকচ্ছটা নামে।

এই আলোর পেছনে রয়েছে সমুদ্রের অতি ক্ষুদ্র জীব। বিশেষ করে ডাইনোফ্ল্যাজেলেট নামের এক ধরনের প্ল্যাঙ্কটন পানিতে নড়াচড়া বা অন্য কোনো উদ্দীপনা পেলে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নীলচে আলো তৈরি করে। ঢেউ ভাঙা, নৌকার চলাচল বা পানিতে পায়ের নড়াচড়ায় একসঙ্গে অনেক জীব আলো ছড়ালে সমুদ্রজুড়ে ঝিলিক দেখা যায়।

অন্ধকার যত গভীর, দৃশ্য তত স্পষ্ট

জৈব-আলোকচ্ছটা দেখতে কৃত্রিম আলো কম থাকা রাত সবচেয়ে উপযোগী। চাঁদের আলো কম থাকলে এবং আকাশ অন্ধকার হলে পানির ক্ষীণ নীল আলো তুলনামূলক স্পষ্ট দেখা যায়। তবে এই দৃশ্য প্রতিদিন বা সারা বছর নিশ্চিতভাবে দেখা যায় না।

পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, জোয়ার-ভাটা, বাতাস, পুষ্টি উপাদান এবং প্ল্যাঙ্কটনের ঘনত্বসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণের ওপর এর উপস্থিতি নির্ভর করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সৈকতে গেলেই যে আলো দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

যেসব গন্তব্যে দেখা মেলে

মালদ্বীপের বিভিন্ন দ্বীপ ও প্রবালপ্রাচীরের আশপাশে এই প্রাকৃতিক আলোকচ্ছটা দেখা যায়। বিশেষ করে রা আতোলের ভাধু দ্বীপের ‘সী অব স্টারস’ নামে পরিচিত সৈকত এ কারণে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। তবে দ্বীপটির নামের সঙ্গে এই দৃশ্যের সম্পর্ক থাকলেও সেখানে প্রতিরাতেই আলো দেখা যাবে এমন নয়।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের পুয়ের্তো রিকোর মস্কিটো বে, লাগুনা গ্রান্দে ও লা পারগুয়েরার মতো স্থানেও জৈব-আলোকচ্ছটা দেখা যায়। পুয়ের্তো রিকোয় তিনটি পরিচিত জৈব-আলোকিত উপসাগর রয়েছে।

মেক্সিকোর কিছু উপকূল এবং অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি এলাকাতেও মৌসুমি ও পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই দৃশ্য দেখা যেতে পারে।

ভ্রমণের আগে যা জানা জরুরি

রাতে সমুদ্র দেখতে গেলে স্থানীয় অনুমোদিত নৌভ্রমণ সেবা বা অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়া নিরাপদ। আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা ও স্থানীয় সমুদ্র পরিস্থিতি আগে জেনে নেওয়া উচিত।

এ ছাড়া সামুদ্রিক জীব ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। পর্যটকদের মনে রাখা দরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবিতে দীর্ঘ এক্সপোজারের কারণে আলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল দেখাতে পারে।

প্রকৃতিতে দেখা এই নীল আলোর রহস্য তাই কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়। অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীবের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াই অন্ধকার সমুদ্রকে সাময়িকভাবে আলোকিত করে।