ভারতের মহারাষ্ট্রের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র লোনাভালার কাছে অবস্থিত প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো লোহাগড় দুর্গ আবারও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি সেখানে এক দর্শনার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় দুর্গটি নতুন করে সংবাদ শিরোনামে উঠে এলেও, ভ্রমণপ্রেমী ও ইতিহাস অনুরাগীদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য, লোককথা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত।

সাহিয়াদ্রি পর্বতমালার বুকে অবস্থিত লোহাগড় দুর্গ বর্ষাকালে সবুজ প্রকৃতি, মেঘে ঢাকা পাহাড়ি পরিবেশ এবং ট্রেকিং পথের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়। তবে এর প্রাচীন ইতিহাসের পাশাপাশি দুর্গটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যময় কাহিনি, যা স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত।

দুর্গের সবচেয়ে আলোচিত লোকগাথা জড়িয়ে আছে এর প্রধান প্রবেশপথ ‘গণেশ দরজা’কে ঘিরে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মারাঠা আমলের এক দুর্গ প্রশাসক স্বপ্নে দেখেছিলেন যে ফটকটির ভিত্তি দুর্বল ও অভিশপ্ত। এরপর সেটিকে মজবুত করতে এক নারী ও এক পুরুষকে জীবন্ত সমাহিত করে নরবলি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এ ঘটনার পক্ষে কোনো নথিভুক্ত বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। তারা এটিকে লোককথা হিসেবেই বিবেচনা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্টে গল্পটি এখনও ব্যাপকভাবে আলোচিত। বিভিন্ন ভ্রমণব্লগার, কনটেন্ট নির্মাতা ও স্থানীয় গাইডদের বর্ণনায় এটি নতুন প্রজন্মের পর্যটকদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।

গণেশ দরজার গল্পের পাশাপাশি দুর্গটিকে ঘিরে আরও নানা রহস্যময় দাবি রয়েছে। অনেক ট্রেকার রাতের শেষ ভাগে দুর্গের দেয়ালসংলগ্ন এলাকায় ছায়ামূর্তি দেখার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, সূর্যাস্তের পর নির্জন অংশে শিসের শব্দ, পায়ের আওয়াজ কিংবা অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঘন কুয়াশা ও প্রবল পাহাড়ি বাতাসের কারণে পরিবেশ আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে।

তবে এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। সংশয়বাদীদের মতে, দুর্গের পাথুরে স্থাপত্য, পাহাড়ি বাতাস এবং প্রতিধ্বনির প্রভাব থেকেই এমন শব্দের সৃষ্টি হতে পারে।

ইতিহাসের দিক থেকে লোহাগড় দুর্গের গুরুত্বও কম নয়। সাতবাহন আমলে এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে ছত্রপতি শিবাজীর শাসনামলে এটি মারাঠা সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, কোষাগার ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে দুর্গটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

বর্তমানে দুর্গের ভেতরে বিশাল পাথরের তোরণ, প্রাচীন জলাধার এবং বিচ্ছুর লেজের মতো দেখতে দীর্ঘ শৈলশিরা ‘বিঞ্চু কাটা’ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া গুপ্ত সুড়ঙ্গ ও লুকানো ধনসম্পদের নানা গুঞ্জনও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে, যদিও এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইতিহাস, প্রকৃতি, ট্রেকিং ও লোককথার অনন্য মিশ্রণের কারণে লোহাগড় দুর্গ আজও ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ভ্রমণগন্তব্য হিসেবে পর্যটকদের কৌতূহল জাগিয়ে রাখছে।

তথ্যবক্স

অবস্থান: লোনাভালার নিকটবর্তী, মহারাষ্ট্র, ভারত

বিশেষ আকর্ষণ: ট্রেকিং, বর্ষার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গণেশ দরজা, বিঞ্চু কাটা

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক কেন্দ্র

পরিচিতি: ইতিহাস, লোককথা ও রহস্যময় পরিবেশের জন্য বিখ্যাত