বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং নগর পরিকল্পনার এক অনন্য নিদর্শন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট। অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, মাজার, দিঘি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ঘনত্বের কারণে এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘মসজিদের শহর’ নামে পরিচিত। ১৫শ শতকে নির্মিত এসব স্থাপনা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসই নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৫শ শতকে তুর্কি বংশোদ্ভূত সেনাপতি ও সুফি সাধক খান জাহান আলী এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন সমৃদ্ধ নগরী ‘খলিফাতাবাদ’। এটি ছিল প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক এই নগরীতে সুলতানি আমলে নির্মিত হয়েছিল তিন শতাধিক মসজিদ, রাস্তা, সেতু এবং দিঘি। সময়ের প্রবাহে অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মসজিদ আজও টিকে আছে। এসব স্থাপনার স্থাপত্যে দেখা যায় পোড়ামাটির ইট, মোটা দেয়াল, বহু গম্বুজ এবং স্বতন্ত্র নকশার ব্যবহার। গবেষকদের কাছে এটি ‘খান জাহান স্টাইল’ নামে পরিচিত, যা দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কোর মূল্যায়নে বলা হয়, এই স্থাপত্যসমূহ মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের অসাধারণ নিদর্শন।

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ। নাম ষাট গম্বুজ হলেও প্রকৃতপক্ষে মসজিদটিতে রয়েছে ৬০টিরও বেশি গম্বুজ, গবেষকদের মতে সংখ্যা ৭৭ কিংবা ৮১টি হতে পারে।

এ ছাড়া ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ এবং জিন্দা পীর মসজিদসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখানে অবস্থিত।

ঐতিহাসিক নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খান জাহান আলীর মাজার, যা আজও দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর খুব কম শহরেই এত অল্প এলাকায় ১৫শ শতকের ইসলামি স্থাপত্যের এত ঘন উপস্থিতি দেখা যায়। এই কারণেই বাগেরহাটকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নগরী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বর্তমান প্রশাসনিক মানচিত্রে বাগেরহাট বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলা শহর। এটি খুলনা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।

ঐতিহাসিকভাবে শহরটির আরেক নাম ছিল খলিফাতাবাদ। মধ্যযুগে এটি শাহী বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল।

বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী Forbes একসময় বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া শহরগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে ৫০টির বেশি ইসলামি স্থাপত্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক নগরীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।