দিনাজপুরে মোগল আমল ও রাজ শাসনের সাক্ষ্য বহনকারী পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী দিঘী আজ অবহেলা আর অযত্নে হারাতে বসেছে। একসময় জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও পানির প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত এসব দিঘী এখন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে জৌলুস। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটনের আওতায় আনা হলে এই ঐতিহাসিক সম্পদ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
জেলা শহর ও সদর উপজেলায় অবস্থিত এসব দিঘী বহু বছর ধরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে ‘জুলুম সাগর’ মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতির ধারক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এই দিঘীতে ফেলে দেয়। স্থানীয়রা এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি তত্ত্বাবধানের অভাবে দিঘীগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক দুর্গ ও ঘোড়াশালাও বিলুপ্তির পথে। মোগল আমলে এখানে সৈন্যদের জন্য ঘোড়া প্রশিক্ষণের বিশাল কেন্দ্র ছিল, যেখান থেকে যুদ্ধোপযোগী ঘোড়া দিল্লিতে পাঠানো হতো।
দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন জানান, তৎকালীন শাসকরা জনসাধারণের পানির চাহিদা পূরণের জন্য এসব দিঘী খনন করেছিলেন। গোসল, পানীয় জল ও গবাদিপশুর প্রয়োজন মেটাতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। দিঘীগুলোর চারপাশে নান্দনিক ঘাট, পাকা সিঁড়ি ও বসার স্থান নির্মাণ করা হয়েছিল, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত।
বর্তমানে এসব দিঘীতে মাছ চাষ হলেও আগের মতো ব্যবহার নেই। তবে শীত মৌসুমে পিকনিক ও ভ্রমণে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় এলাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলোকে পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুললে রাজস্ব আয়েরও বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে রামসাগর, সুখসাগর, মাতাসাগর, আনন্দসাগর ও জুলুম সাগর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহারাজা রামনাথের খনন করা রামসাগর আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। অন্যদিকে সুখসাগর বর্তমানে ইকোপার্কে রূপ নিলেও মাতাসাগর ও আনন্দসাগর দখল ও অবহেলার শিকার।
জুলুম সাগরকে ঘিরে রয়েছে ভয়াবহ ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এখানে বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের জালে মানবদেহের হাড়গোড় পাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা এ স্থানের ইতিহাসকে আরও মর্মস্পর্শী করে তুলেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিকদের অভিমত, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এসব দিঘী সংরক্ষণ করা জরুরি। তা না হলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনগুলো অচিরেই হারিয়ে যাবে।