পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের দুর্গম ইশকোমান উপত্যকা। চারদিকে তুষারঢাকা পাহাড়, হিমবাহের পানিতে বয়ে চলা নদী, পাহাড়ি পথে ভেড়ার পাল আর স্থানীয় লোকবিশ্বাসের রহস্যময় জগৎ। পর্যটকদের ভিড় থেকে দূরে অবস্থিত এই উপত্যকায় রয়েছে এমন এক নারী, যিনি পরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে পারেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালিয়ে এই উপত্যকায় পৌঁছেছিলেন এক পর্যটক। তিন দিনের দীর্ঘ যাত্রায় তিনি পাড়ি দেন বিখ্যাত কারাকোরাম হাইওয়ে। বিশ্বের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পাকা সড়কগুলোর অন্যতম এই পথ প্রাচীন সিল্ক রোডের ধার ঘেঁষে এগিয়েছে। পথে দেখা মেলে ফিরোজা রঙের সিন্ধু নদ, দুর্গম পাহাড় আর ৮ হাজারি নাঙ্গা পর্বতের।
পাহাড়ের কোলে নিরিবিলি আশ্রয়
উপত্যকার চাতোরখান্দ এলাকায় অবস্থিত ‘কায়োট ডেন ইশকোমান হোস্টেল’। বাজেটের মধ্যে ভ্রমণ করতে আগ্রহী পর্যটক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য তৈরি এই আবাসনে রয়েছে পাথরের কটেজ, গোলাপের বাগান, রঙিন কাচের জানালা এবং স্থানীয় নকশার কার্পেট। কাঠ ও পাথরের মতো নির্মাণসামগ্রী আশপাশের এলাকা থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।
এখানে পর্যটকরা ভেড়ার পালের সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে, নদীর ধারে সময় কাটাতে এবং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা উপভোগ করতে পারেন। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য রয়েছে নালতার থেকে ইশকোমান পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটারের ট্রেকিং রুট। তিন থেকে চার দিনের এই যাত্রায় ৪ হাজার ৭০০ মিটার উঁচু পাকোরা গিরিপথ এবং হিমবাহ পার হতে হয়।
পরিদের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি
ইশকোমান অঞ্চলের অন্যতম আলোচিত বাসিন্দা রশিদা নামের এক নারী। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তিনি পাহাড়ি পরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন।
এ অঞ্চলের প্রাচীন চিত্রালি লোককথায় ‘পেরি’ নামে পরিচিত ডানাওয়ালা অতিপ্রাকৃত সত্তার উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পরিরা মানুষ ও ঐশ্বরিক জগতের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকে। অতীতে শামান বা আধ্যাত্মিক সাধকেরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতেন। সময়ের সঙ্গে এই প্রথা কমে এলেও কিছু এলাকায় এখনো এর চর্চা রয়েছে।
রশিদার কাছে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি হোস্টেলে থাকা পর্যটকেরাও যান। এক ভ্রমণকারী দোভাষীদের সহায়তায় নিজের ভবিষ্যৎ, পেশা পরিবর্তন এবং দাম্পত্য জীবন নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন। তবে এসব ভবিষ্যদ্বাণী স্থানীয় লোকবিশ্বাসের অংশ, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোনো পদ্ধতি নয়।
স্থানীয় সংস্কৃতি ও নারীর কর্মসংস্থান
ইশকোমান উপত্যকায় সন্ধ্যা কাটে ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে। ডাডাং ঢোল এবং রুবাবের সুরে স্থানীয় পুরুষদের ‘দানি হারিপ’ নৃত্য এখানকার সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের সীমিত সুবিধার কারণে স্থানীয় মানুষের সামাজিক আড্ডা ও ঐতিহ্যবাহী বিনোদন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
হোস্টেলটির অর্ধেক কর্মী নারী। স্থানীয় সামাজিক রীতি বিবেচনায় রেখে তাঁদের নমনীয় কর্মঘণ্টা দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা সন্তানদের দেখাশোনা করতে পারেন এবং সূর্যাস্তের পর কাজের চাপ এড়িয়ে চলতে পারেন।
ইশকোমান উপত্যকার আকর্ষণ তাই শুধু পাহাড়, নদী কিংবা অ্যাডভেঞ্চারে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির নির্জনতা, প্রাচীন লোকবিশ্বাস, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং নারীর কর্মসংস্থানের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এটি পাকিস্তানের এক ব্যতিক্রমী ভ্রমণগন্তব্য।