একসময় এভারেস্ট জয় মানেই ছিল অসাধারণ মানবিক সক্ষমতার প্রমাণ। এটি ছিল দুঃসাহসিক ভ্রমণের সর্বোচ্চ অর্জন। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতে উঠতে হলে অভিজ্ঞ পর্বতারোহী, দুর্দান্ত শারীরিক সক্ষমতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা—সবই প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন সমালোচকদের চোখে এভারেস্ট অভিযান অনেকটাই হয়ে উঠেছে টাকা ও অবসর সময়ের প্রদর্শনী।
১৯২৪ সালে জর্জ ম্যালরি ও অ্যান্ড্রু ‘স্যান্ডি’ আরভিন এভারেস্টের চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে নিখোঁজ হন। তারা সত্যিই চূড়ায় উঠেছিলেন কি না, আজও তা নিশ্চিত নয়। এরপর ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে প্রথম সফলভাবে চূড়ায় পৌঁছান। ১৯৭৮ সালে রাইনহোল্ড মেসনার ও পিটার হ্যাবেলার অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্ট জয় করেন—যা একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেছিল।
কিন্তু এরপর দ্রুত বদলে যায় পরিস্থিতি। বাণিজ্যিক অভিযানের প্রতিষ্ঠানগুলো এভারেস্টে অর্থের বিনিময়ে পর্বতারোহীদের গাইড করে চূড়ায় পৌঁছে দিতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এক ঝড়ে আটজন পর্বতারোহী মারা যান। ঘটনাটি জন ক্রাকাওয়ারের বিখ্যাত ‘ইনটু থিন এয়ার’ গ্রন্থে উঠে আসে। তবে এই বিপর্যয়ও এভারেস্ট অভিযানের জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি।
২০২৬ সালের বসন্ত মৌসুমে এভারেস্টে রেকর্ডসংখ্যক ৪৯৫টি ক্লাইম্বিং পারমিটি দেওয়া হয় এবং ১,০০৮টি সামিট সম্পন্ন হয়। শুধু ২০ মে একদিনেই ২৭৪ জন চূড়ায় ওঠেন, যা ২০১৯ সালের ২২৩ জনের আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে এভারেস্টের চূড়ার পথে এখন অনেক সময় দীর্ঘ সারি দেখা যায়—যেন বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত নয়, কোনো জনপ্রিয় উৎসবের প্রবেশপথ।
তবে বিপুল অর্থ খরচ করলেও এভারেস্ট এখনো ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৬ সালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, ২০২৫ সালেও মারা গিয়েছিলেন পাঁচজন। আগের দুই বছরে আরও ২৬ জন প্রাণ হারান।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করেন শেরপারা। মূলত নেপালের এই দক্ষ পর্বতারোহীরা অভিযাত্রীদের পথ দেখান, অক্সিজেন ও সরঞ্জাম বহন করেন এবং তাঁবু স্থাপনসহ নানা কঠিন কাজ করেন। এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসে ১৩০-এর বেশি শেরপা মারা গেছেন। অথচ চূড়ায় উঠে ছবি তুলে নিজেদের কৃতিত্ব জানান দেওয়া অনেক ধনী অভিযাত্রীর তুলনায় তাদের অবদান কমই আলোচিত হয়।
কামি রিতা শেরপা এখন পর্যন্ত ৩২ বার এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন—যা মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক সফল আরোহণ। প্রতিবারই তাকে জীবন বাজি রাখতে হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল অর্থ এভারেস্ট আরোহণকে অনেক সহজ করেছে। অতিরিক্ত অক্সিজেন, আগেই উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা, স্থায়ী দড়ি, সার্বক্ষণিক গাইড, বেস ক্যাম্পে ব্যক্তিগত শেফ—সবই এখন পাওয়া যায়। এমনকি হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়।
তাই প্রশ্ন উঠছে, এভারেস্ট জয় কি এখনো আগের মতো অসাধারণ অর্জন? পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে ঝুঁকির বড় অংশ অন্যদের ওপর দিয়ে, প্রস্তুতি ও সহায়তার বিশাল ব্যবস্থার মাধ্যমে চূড়ায় ওঠা সম্ভব। ফলে একসময় যে অভিযান ছিল মানবসীমা অতিক্রমের প্রতীক, সেটিই এখন অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে অর্থ ও অহংকারের প্রদর্শনী।
শেষ পর্যন্ত, এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ব্যক্তিই হয়তো আসল নায়ক নন। বরং যিনি সেই ছবি তোলার আগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে তাকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছেন—সেই শেরপাই হতে পারেন প্রকৃত নায়ক।