ভ্রমণের বড় একটা সুবিধা হলো, এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় এবং নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে থাকা পৃথিবীকে চিনতে শেখায়। 
তবে পৃথিবীতে মানুষের প্রকৃত স্বভাব বোঝার জন্য হোটেলের সকালের নাশতার টেবিলের চেয়ে ভালো জায়গা বোধহয় আর নেই।
যুক্তরাজ্যের ফার আউট সাময়িকীতে ভ্রমণ লেখক স্যাম ফ্যারলে লিখেছেন, “বিদেশের কোনো হোটেলে সকাল সকাল আমাকে শুধু একটি ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসিয়ে দিন—সভ্যতা সম্পর্কে অনেক কিছুই বলে দিতে পারব।”
তার ভাষায়, “সামান্য হ্যাংওভার, দেখতে বাসি মনে হওয়া পেস্ট্রি আর কাদামাটির মতো কফির মগ— এর মধ্যেই মানুষের স্বভাব যেন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”
হোটেল ব্রেকফাস্টের মজার বিষয় হলো, এটি হওয়ার কথা সবার জন্য একই রকম। ঘুম থেকে ওঠা, গোসল করা, নাশতা খাওয়া এবং এরপর ঘুরতে বের হওয়া—ব্যাপারটা এতই সহজ। কিন্তু বাস্তবে দেশভেদে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি শুধু নাশতা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক দলিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় আমরা কোন দেশে আছি, হোটেলের মান কেমন এবং সীমাহীন বেকন বা যত খুশি সিরিয়াল সামনে থাকলে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ কতটা।
ব্রেকফাস্ট বুফে আধুনিক জীবনের এমন একটি জায়গা, যেখানে অল্প সময়ের জন্য অপরিচিত মানুষদের সামাজিক পরিচয় যেন আড়ালে চলে যায়। কে ধনী, কে চাকরিজীবী, কে ব্যবসায়ী বা কোন দেশের নাগরিক—এসব তখন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায় নানা ধরনের মানুষ। কেউ বুফের দিকে ছুটছেন যেন যুদ্ধক্ষেত্রে নামছেন। ব্যবসায়ী অতিথি এক হাতে মোবাইল ধরে ই-মেইল দেখছেন, অন্যদিকে দ্রুত একটি সেদ্ধ ডিম ও কালো কফি খেয়ে নিচ্ছেন। আবার আছেন আগের রাতের পার্টির ক্লান্ত পর্যটক—চোখে সানগ্লাস, গায়ে হুডি। আছে চার সদস্যের পরিবার, যারা খাবারের সর্বোচ্চ মূল্য উসুল করতে প্লেটে একের পর এক প্যানকেক জমাচ্ছে।
তারপর আসে খাবারের বৈচিত্র্য। ব্রিটিশদের ফুল ইংলিশ ব্রেকফাস্ট—তেলচিটে, ভারী, কিন্তু তাদের নিজস্ব। জার্মানদের ঠান্ডা মাংস, চিজ ও রাই ব্রেড। ফরাসিদের নিখুঁত পেস্ট্রি। পূর্ব ইউরোপে দই ও মিউজলি। সুইজারল্যান্ডে স্বাস্থ্যকর খাবারের ঝোঁক। আর যুক্তরাষ্ট্রে প্যানকেক, বেকন ও সিরাপ।
তবে এ চিত্র অনেকটাই পশ্চিমা হোটেলকেন্দ্রিক। কারণ এশিয়ার নাশতার সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি বদলে যায়। সকালে ভাত বা নুডলস খাওয়ার অভিজ্ঞতা যে কতটা চমৎকার, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
হোটেলের ব্রেকফাস্ট শুধু খাবার নয়, একটি সামাজিক নাটকও। কে শেষ ক্রসাঁটি নেবে, কেউ সেটা নেওয়ার আগে দ্বিধায় ভুগছে কি না, পাশের টেবিলে নিচুস্বরে কথা বলা বা তর্ক—সবই দেখার মতো। কেউ আবার হাতে হোটেলের বিনা মূল্যের শহরের মানচিত্র নিয়ে দিনের পরিকল্পনা করছেন, যেন কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করবেন।
ব্রেকফাস্টের আয়োজন হোটেল সম্পর্কেও অনেক কিছু বলে। ইনস্ট্যান্ট কফি, নরম সসেজ ও প্লাস্টিকে মোড়ানো বান থাকলে বোঝা যায় খরচ কম রাখাই তাদের লক্ষ্য। অন্যদিকে শেফ যদি অতিথির সামনে খাবার তৈরি করেন, তাহলে হোটেলের সেবার মান ও আতিথেয়তার প্রতি মনোভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে সত্যি বলতে, হোটেলের ব্রেকফাস্ট বেশিরভাগ সময় অসাধারণ হয় না। বাইরে স্থানীয় কোনো দোকান বা রেস্তোরাঁয় গেলে অনেক বেশি সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়। তবু প্রতিটি ভ্রমণে অন্তত একবার হোটেলের ব্রেকফাস্টে বসা উচিত। কারণ খাবারের পাশাপাশি সেখানে দেখা যায় মানুষের এক অসাধারণ স্বাভাবিক রূপ—যেন জঙ্গলে বসে ডেভিড অ্যাটেনবরোর মতো অন্য মানুষদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। আর নাশতার খরচ তো ভ্রমণের সঙ্গে আগেই দেওয়া হয়ে গেছে—তাই পেট ভরে খেয়ে নেওয়াই ভালো।