আপনি যদি তারবিহীনভাবে ফোনের সঙ্গে হেডফোন বা ল্যাপটপ সংযুক্ত করে থাকেন, তাহলে ব্লুটুথ নামটির সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচিত। প্রযুক্তিটি আধুনিক হলেও এর নামের ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন ডেনমার্কের এক ভাইকিং রাজা, যার স্মৃতি আজও দেশটির ছোট্ট শহর জিলিংয়ে টিকে আছে।

বিবিসি লিখেছে, কোপেনহেগেন থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জিলিংয়ের দুটি প্রাচীন রুনস্টোনে সেই রাজার শাসনের ইতিহাস লেখা রয়েছে। আর এই পাথরগুলোর সূত্র ধরেই জানা যায়, কীভাবে এক ভাইকিং রাজার অদ্ভুত ডাকনাম বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তির নাম হয়ে গেল।

ব্লুটুথ নামের সেই ভাইকিং রাজা

রাজা হারাল্ড গোরমসন দশম শতকে ডেনমার্ক শাসন করতেন। তার ডাকনাম ছিল ব্লুটুথ। পুরোনো নর্স ভাষায় ব্লাটওন। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর প্রথম এই ডাকনামের লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, নামটি তার একটি নীলচে বা পচা দাঁতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

হারাল্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ডেনমার্ককে খ্রিস্টধর্মে রূপান্তর করা। ধারণা করা হয়, প্রায় ৯৬৫ সালের দিকে এই পরিবর্তন ঘটে। হারাল্ডের নির্দেশে তৈরি জিলিংয়ের বড় রুনস্টোনে লেখা রয়েছে, তিনি “পুরো ডেনমার্ক ও নরওয়ে জয় করেছিলেন এবং ডেনদের খ্রিস্টান করেছিলেন”। পাথরটিতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় যিশুখ্রিস্টের অন্যতম প্রাচীন চিত্রও রয়েছে।

তখন উত্তর ইউরোপ ছোট ছোট অঞ্চল ও গোত্রপ্রধানদের নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত ছিল। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে হারাল্ড নিজের ক্ষমতা সংহত করার পাশাপাশি ডেনমার্কের সঙ্গে খ্রিস্টান ইউরোপের সম্পর্কও শক্তিশালী করেন। একই সঙ্গে এটি একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে ডেনমার্ককে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করে।

ডেনমার্কের ‘জন্মসনদ’ জিলিং

হারাল্ডের বাবা গোরম তাঁর স্ত্রী থাইরার স্মরণে জিলিংয়ে ছোট ও পুরোনো রুনস্টোনটি তৈরি করিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, দেশের ভেতরে ‘ডেনমার্ক’ নামটির প্রথম লিখিত ব্যবহার এই পাথরেই রয়েছে। তাই এটিকে ডেনমার্কের ‘জন্মসনদ’ বলা হয়।

বর্তমানে জিলিংয়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ বাস করলেও হারাল্ডের সময়ে এটি ছিল ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একসময় এটি ছিল পৌত্তলিক সমাধিস্থল। পরে হারাল্ডের শাসনামলে সেখানে পৌত্তলিক ও খ্রিস্টান—দুই সংস্কৃতির প্রভাব পাশাপাশি দেখা যায়।

জিলিংয়ের গির্জা, সমাধির ঢিবি ও রুনস্টোনগুলো ১৯৯৪ সালে ডেনমার্কের প্রথম ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ভাইকিং রাজা থেকে প্রযুক্তির নাম

এক হাজার বছর পর হারাল্ডের ‘ঐক্যবদ্ধকারী’ পরিচয় আবারও নতুনভাবে সামনে আসে।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তোশিবা, আইবিএম, নোকিয়া, ইন্টেল ও এরিকসনের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করছিলেন, যা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিভাইসকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারবে। প্রযুক্তিটির একটি কোডনেম প্রয়োজন ছিল।

ইন্টেলের প্রকৌশলী জিম কারডাচ তখন সুইডিশ প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন। ভাইকিংদের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হয়ে তিনি হারাল্ডের ইতিহাস পড়েন। ডেনমার্ক ও নরওয়েকে একত্রিত করা হারাল্ডের সঙ্গে বিভিন্ন ডিভাইসকে একত্রিত করার নতুন প্রযুক্তির মিল খুঁজে পান তিনি। সেখান থেকেই আসে ব্লটুথ নামটি।

নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই ফাঁস হয়ে যায়। প্রথমে জনসংযোগ কর্মকর্তারা নামটি পছন্দ করেননি। কারণ ব্লটুথ শুনে তাদের খারাপ দাঁতের কথা মনে হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নামটি বদলানো হয়নি। বরং এর স্বাতন্ত্র্যই নামটিকে জনপ্রিয় করে তোলে।

ব্লুটুথের লোগোতেও রয়েছে সেই ভাইকিং রাজার স্মৃতি। এতে হারাল্ড ব্লুটুথের নামের আদ্যক্ষর H ও B-এর প্রতিনিধিত্বকারী দুটি নর্স রুন একত্র করা হয়েছে।

২০২৩ সালে প্রযুক্তিটির ২৫ বছর পূর্তিতে এর প্রতিষ্ঠাতারা জিলিংয়ে গিয়ে মজা করে হারাল্ডের নাম অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের জন্য ‘ক্ষমা’ চান। জাদুঘরও সেই ‘ক্ষমা’ গ্রহণ করে এবং আগামী এক হাজার বছর নামটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

আজ প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ‘ব্লুটুথ’ শব্দটি ব্যবহার করেন—যে নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরের পুরোনো এক ভাইকিং রাজার গল্প।