কারও কাছে হোটেল শুধু কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর জায়গা, ভ্রমণের পথে এক ধরনের বিশ্রামকেন্দ্র। আবার কারও কাছে হোটেল নিজেই একটি অভিজ্ঞতা—যেখানে থাকা, সময় কাটানো এবং পরিবেশ উপভোগ করাই ভ্রমণের অংশ।
হোটেল সাধারণত অস্থায়ী জায়গা। মানুষ আসে, থাকে, আবার চলে যায়। কিন্তু কিছু হোটেল নিজেরাই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় এসব ভবন কখনো দখল করেছে আক্রমণকারী সেনারা, কখনো আবার শত্রুর বোমা থেকে বাঁচতে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সেখানে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এসব হোটেল টিকে আছে, আর এখন সেখানে পর্যটকেরা অস্ত্র নয়, স্যুটকেস নিয়ে আসেন।
সিঙ্গাপুরের র্যাফেলস হোটেল ১৮৮৭ সালে চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই এটি বিলাসিতা ও আভিজাত্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। ১৯৪২ সালে জাপানি বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করলে হোটেলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং নাম দেওয়া হয় ‘সিওনান রিয়োকান’। কথিত আছে, দখলের আগে হোটেলের রুপার সামগ্রী লুটের হাত থেকে বাঁচাতে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধের পর এটি কিছু সময় মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবন্দীদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে আবার র্যাফেলস নাম ফিরে পায়।
প্যারিসের হোটেল লুতেসিয়া ১৯১০ সালে চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী ফ্রান্স দখল করলে হোটেলটি জার্মান সেনাবাহিনী ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আবভেয়ারের দখলে যায়। ফরাসি প্রতিরোধযোদ্ধাদের দমনেও জায়গাটি ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে এর ভূমিকা পুরোপুরি বদলে যায়। কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা মানুষদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এটি। বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলো সেখানে আবার একে অপরকে খুঁজে পায়।
জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেল ১৯৩০ সালে চালু হয় এবং ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৬ সালে ইরগুন নামের একটি জিওনিস্ট সংগঠন হোটেলের দক্ষিণ অংশে বোমা হামলা চালায়। এতে ৯১ জন নিহত হন এবং ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপরও হোটেলটি টিকে থাকে এবং এখনো উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের আতিথ্য দেয়।
বাগদাদের আল-রশিদ হোটেল ১৯৮২ সালে চালু হয়ে ইরাকের ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসন—সবকিছুর মধ্যেই হোটেলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাংবাদিকদের অবস্থানস্থল হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়। ২০০৯ সালের বোমা হামলার পর ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সংস্কার করতে হয়। ২০২৬ সালের ইরান-যুদ্ধের সময়ও হোটেলের ওপরের দুটি তলায় ইরানি ড্রোন আঘাত হানে।
হ্যানয়ের মেট্রোপোল হোটেল গত শতাব্দীর শুরুতে ফরাসি ইন্দোচীনের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেল ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এটি কূটনীতিকদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয় এবং ‘এম্বেসি হাউস’ নামে পরিচিতি পায়। হোটেলের নিচে তৈরি করা হয়েছিল কংক্রিটের বোমা আশ্রয়কেন্দ্র। ১৯৭২ সালের ক্রিসমাস বোমাবর্ষণের সময় গায়িকা জোয়ান বায়েজও সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর আশ্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১১ সালে সংস্কারের সময় এটি আবার আবিষ্কৃত হয় এবং এখন পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।