দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে নাৎসি পার্টি তাদের মতাদর্শ প্রচার ও জনপ্রিয় করার নানা উপায় খুঁজছিল। প্রচলিত প্রচারণার পাশাপাশি তারা এমন একটি বিশাল অবকাশকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করে, যেখানে একই সময়ে সর্বোচ্চ ২০ হাজার মানুষ অবস্থান করতে পারবে।
জার্মানির বাল্টিক উপকূলের কাছে রুগেন দ্বীপে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় এই বিশাল রিসোর্ট। এখানে পর্যটকরা সাঁতার কাটবেন, সাইকেল চালাবেন, হাঁটাহাঁটি করবেন, কনসার্ট উপভোগ করবেন এবং নাৎসি মতাদর্শের নানা দিক সম্পর্কে জানবেন।
এটাই ‘প্রোরার কলোসাস’-এর গল্প—একটি বিশাল স্থাপনা, যার পেছনে ছিল ভয়ংকর নাৎসি মতাদর্শ, ছিল বিশাল পরিকল্পনা। পরে দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস পেরিয়ে সেই স্থানই কীভাবে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হলো, সেটিও এই গল্পের অংশ।
১৯৩০-এর দশকে নাৎসি সংগঠন ক্র্যাফট ডার্চ ফ্রুডে, যার অর্থ ‘আনন্দের মাধ্যমে শক্তি’, জার্মানির রুগেন দ্বীপে এই অবকাশকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করে। স্থপতি ক্লেমেন্স ক্লোটজকে নকশার দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ১৯৩৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এই সংগঠনটি ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এর লক্ষ্য ছিল দেশের শ্রমজীবী মানুষের অবসর সময়কে সংগঠিত করা এবং নাৎসি কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত করা। থিয়েটার, খেলাধুলা, ছুটি কাটানো কিংবা ক্রুজ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই নাৎসি মতাদর্শ প্রচার করা হতো।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের এমন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল, যা আগে মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্যই সীমিত ছিল। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত ও কৃতজ্ঞ নাগরিক তৈরি করাও ছিল উদ্দেশ্য।
বেতন না বাড়িয়েও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা গেলে রাষ্ট্রকে সফল হিসেবে দেখানো সম্ভব হবে—এমনটাই ছিল তাদের প্রচারণার কৌশল।
তবে ছুটি কাটানোর ক্ষেত্রেও ছিল বর্ণবাদী বৈষম্য। পরিকল্পনায় স্পষ্ট ছিল, ইহুদি, রোমা জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক বিরোধীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রোরার এই অবকাশসুবিধা পাবে না। অর্থাৎ এটি মোটেও সাধারণ কোনো সমুদ্রসৈকতভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ছিল না।
ক্লেমেন্স ক্লোটজের নকশা ছিল অসাধারণ বড়। স্থাপনাটি প্রায় তিন মাইল বা পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। আটটি বিশাল আবাসিক ভবনে একসঙ্গে ২০ হাজার মানুষ থাকতে পারতেন। প্রতিটি কক্ষের জানালা ছিল বাল্টিক সাগরের দিকে, আর ভবনের অপর পাশে ছিল সামষ্টিক কক্ষ ও অন্যান্য অবকাঠামো।
এই বিশাল কংক্রিটের স্থাপত্যের আকারও ছিল রাজনৈতিক বার্তার অংশ। এর মাধ্যমে নাৎসি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও সামর্থ্য প্রদর্শন করা হতো। ভবনের সাদামাটা ও প্রায় একই ধরনের নকশার মধ্যেও ছিল ঐক্য ও একতার ধারণা। অতিথিদের একসঙ্গে খাওয়া, ব্যায়াম করা এবং অবসর কাটানোর কথা ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পর্যটকেরা আর আসেননি।
সুইমিং পুল, সিনেমা হল, থিয়েটার, রেস্তোরাঁসহ আরও অনেক কিছু নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও সবকিছু শেষ হয়নি। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রোরা কার্যত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহরে পরিণত হতে পারত।
নির্মাণ শুরুর মাত্র তিন বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা অবশ্য এর আগেই বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রয়োজন হলে প্রোরাকে দ্রুত সামরিক হাসপাতালে রূপান্তর করা যাবে—এমন পরিকল্পনাও ছিল।
শেষ পর্যন্ত সেটিও আর প্রয়োজন হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। ভবন নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও যুদ্ধের কাজে পাঠানো হয়।
বিশাল আবাসিক ভবনগুলোর কংক্রিটের কাঠামো পড়ে থাকে খালি। যুদ্ধ শেষ হয়, ইউরোপে শান্তি ফিরে আসে, আর জার্মানি ভাগ হয়ে যায়। প্রোরাও চলে যায় নতুন পূর্ব জার্মানির অংশে।
সেখান থেকেই শুরু হয় প্রোরার দ্বিতীয় জীবন।
কমপ্লেক্সটি সামরিক স্থাপনায় পরিণত হয়। মূলত ন্যাশনাল পিপলস আর্মির ব্যারাক ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৮০-এর দশকে এখানে সামরিক দায়িত্ব পালনে আপত্তি জানানো ব্যক্তিদেরও রাখা হয়েছিল।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সীমিত ব্যবহারের মধ্যে ছিল। এরপর সেটি ধীরে ধীরে অব্যবস্থাপনা ও অবক্ষয়ের দিকে চলে যায়।
এক সুন্দর সমুদ্র উপকূলীয় পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল স্থাপনা—একটি স্বৈরশাসন ও এমন এক মতাদর্শের ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতিচিহ্ন, যে মতাদর্শ জার্মানি, ইউরোপ এবং এর বাইরের অঞ্চলকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল।
১৯৯৪ সালে প্রোরা ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষিত মর্যাদা পায়। পরে এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়।
২০১০-এর দশক থেকে প্রোরার বিভিন্ন অংশ নতুন করে উন্নয়ন করা শুরু হয়। পুরোনো ভবনগুলো রূপান্তরিত হতে থাকে অ্যাপার্টমেন্ট, ছুটির আবাসন এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থাপনায়।
আজ এখানে থাকা যায়, আশপাশে সাইকেল চালানো যায়, কাছের প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা ঘুরে দেখা যায় এবং জার্মানির অন্যতম সুন্দর সমুদ্রসৈকত উপভোগ করা যায়।
তবে এই পুনঃউন্নয়ন নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—এত নিপীড়নমূলক একটি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাকে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা কতটা নৈতিক?
অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, আজ যেখানে সব বর্ণ ও যৌনপরিচয়ের মানুষ পর্যটক হিসেবে আসতে পারছেন, সেটিই বরং নাৎসি মতাদর্শের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রত্যাখ্যান।
আপনি যে পক্ষেই থাকুন না কেন, একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—নাৎসি সামাজিক প্রকৌশলের অংশ হিসেবে তৈরি করা এই বিশাল কমপ্লেক্স আজ একটি আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র।
তবে অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া হয়নি। প্রোরায় রয়েছে একটি প্রদর্শনী, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে এই রিসোর্টের নকশা নাৎসি নীতি ও প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
প্রোরার আকর্ষণের বড় কারণই হলো এর অতীত ও বর্তমানের এই অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। এখানে ভয়, প্রচারণা ও বিপজ্জনক মতাদর্শের সঙ্গে মিশে গেছে স্থাপত্য, পুনঃউন্নয়ন ও সুন্দর সমুদ্রসৈকত।
নির্মাণ শুরুর প্রায় ৯০ বছর পর প্রোরা অবশেষে আবার পর্যটকদের স্বাগত জানাতে শুরু করেছে। তবে ঠিক সেভাবে নয়, যেভাবে অ্যাডলফ হিটলার একসময় এটি কল্পনা করেছিলেন।