ইউরোপের যেখানেই যান না কেন, সেখানকার পর্যটন অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইতিহাস। পশ্চিমে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স থেকে শুরু করে পূর্বের সাবেক যুগোস্লাভিয়া পর্যন্ত অতীত নানা কৌতূহল ও আকর্ষণের জন্ম দিয়েছে।
এখন পর্যটকেরা বলকান অঞ্চলে ছুটছেন অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক অতীতকে কাছ থেকে দেখতে। কেউ বসনিয়ার পাহাড়ে গিয়ে সাবেক যুগোস্লাভ নেতা জোসিপ ব্রজ টিটোর জন্য তৈরি পারমাণবিক বাঙ্কারে নামছেন, কেউ আবার ক্রোয়েশিয়ায় তার জন্মস্থান দেখতে যাচ্ছেন। যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো এবং তার নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তাদের মৃত্যুর ও দেশটির বিলুপ্তির পরও টিকে আছে।
ট্রাভেল আউট সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও, পরবর্তীতে গড়ে ওঠা দেশগুলোতে ভ্রমণকারী অনেক পর্যটকের মধ্যে সাবেক এই রাষ্ট্রকে ঘিরে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।
‘ইউগো-নস্টালজিয়া’ বলতে বোঝায় সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ—কারও কাছে এটি হারিয়ে যাওয়া একটি যুগের প্রতি টান, আবার কারও কাছে দেশটির প্রতীক, স্থাপনা ও ইতিহাসের প্রতি নিছক কৌতূহল। তবে এটি কোনোভাবেই সবার কাছে একই ধরনের ভালোবাসা নয়, এমনকি রাজনৈতিকভাবেও নিরপেক্ষ কোনো বিষয় নয়।
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সেই সময়ের অর্থও ভিন্ন। কারও কাছে এটি ছিল স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সময়ের সেরা অধ্যায়; আবার কারও কাছে সেটি ছিল কর্তৃত্ববাদ, দমন-পীড়ন ও রক্তপাতের সময়।
মানুষের সেই সময়কে কীভাবে দেখা উচিত, তার কোনো নির্দিষ্ট সঠিক বা ভুল উত্তর নেই। তবে পর্যটনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—জটিল ও বিভক্ত ইতিহাসকেও এমন কিছুতে পরিণত করা, যা মানুষ সরাসরি গিয়ে দেখতে পারে। আর এ ধরনের ইতিহাস দেখার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ যে রয়েছে, সেটি এখন স্পষ্ট।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে পর্যটকেরা যুগোস্লাভিয়া ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন। বরং অনেকের কাছে এটি এমন এক ইতিহাস, যা ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও অভিজ্ঞতার দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুগোস্লাভিয়ার ইতিহাস বিদেশি ও স্থানীয়—উভয় ধরনের পর্যটকের জন্যই শক্তিশালী এক আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরাও বুঝেছেন, এই আগ্রহকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বসনিয়ার কোনিৎস শহরের কাছে অবস্থিত ‘এআরকে ডি-জিরো’, টিটোর পারমাণবিক বাঙ্কার। পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে টিটো, সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রক্ষা করার জন্য বিশাল এই ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৫৩ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে গোপনে এটি তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এটি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত।
সাদা দেয়াল ও দীর্ঘ করিডোরের এই কমান্ড সেন্টারটি নির্মাণে বর্তমান মূল্যে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। ১৯৯২ সালে এটি বসনিয়ার হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বাঙ্কারটি বিস্ফোরণে ধ্বংস করার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। তবে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া কর্মীদের দুজন বিস্ফোরকের সঙ্গে যুক্ত সব তার কেটে দেওয়ায় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
২০১১ সালে বাঙ্কারটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ওই দশকের শেষ নাগাদ এটি বসনিয়ার অন্যতম ব্যতিক্রমী পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। প্রতি বছর এখানে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার পর্যটক আসতে শুরু করেন।
এই জায়গাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে আরও একটি বিষয়। এটি কাচের বাক্সের ভেতরে পুরোনো নিদর্শন রাখা কোনো সাধারণ জাদুঘর নয়। এটি যুগোস্লাভিয়ার ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ, যেখানে পর্যটকেরা হাঁটতে পারেন এবং পুরো স্থাপনাটি ঘুরে দেখতে পারেন।
এ কারণে ডার্ক ট্যুরিজম বা ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়, যুদ্ধ, মৃত্যু ও সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান ভ্রমণে আগ্রহীদের কাছেও এটি বিশেষ আকর্ষণীয়। সাম্প্রতিক বলকান ইতিহাসের ক্ষেত্রে ডার্ক ট্যুরিজমের এই প্রবণতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
২০১৭ সালের এক জরিপে মাত্র ২৩ শতাংশ ক্রোয়েশীয় নাগরিক বলেছিলেন, যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন তাদের জন্য ক্ষতিকর ছিল। তারপরও স্লোভেনিয়া সীমান্তের কাছে কুমরোভে টিটোর শৈশবের বাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে তাকে সরাসরি মহিমান্বিত করা হয় না; বরং তার সঙ্গে সম্পর্কিত ইতিহাসকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং অন্যান্য দেশ থেকেও পর্যটকেরা সেখানে আসেন।
টিটোর জীবন এবং যুগোস্লাভিয়ার ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তবে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার কোন দেশে যাচ্ছেন, তার ওপর টিটোর উত্তরাধিকারকে উপস্থাপনের ধরনও ব্যাপকভাবে বদলে যায়।
বেলগ্রেডের মিউজিয়াম অব ইউগোস্লাভিয়া, যেখানে টিটোর সমাধিও রয়েছে, দেখার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তবে সেখানে টিটো, তার কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের ওপর তার শাসনের প্রভাবের যে গল্প তুলে ধরা হয়, তা অন্য জায়গার বর্ণনার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন এখনো মানুষকে আকর্ষণ করে, তেমনি সাবেক যুগোস্লাভিয়াও কৌতূহল তৈরি করে। বিশাল কংক্রিটের স্থাপনাগুলো অনেক পর্যটকের কাছে নান্দনিক সৌন্দর্য বহন করে। কিন্তু যারা সেই সময়ের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে একই স্থাপনা হয়তো দুঃখ, ভয় বা কষ্টের স্মৃতি বহন করে।
এমনকি কেউ কেউ রাজনীতি ও পরবর্তী সময়ের শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়কে পাশে সরিয়ে কল্পনা করেন—যদি যুগোস্লাভিয়া আজও থাকত, তাহলে বিশ্বকাপ বা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তাদের ফুটবল দল কেমন করত!
ফলে পর্যটনশিল্প কার্যত একই সময়ে তিন ধরনের যুগোস্লাভিয়া বিক্রি করছে।
যারা সেই যুগে বেঁচে ছিলেন, কিংবা যাদের পরিবারের সদস্যরা সেই সময় দেখেছেন, তাদের জন্য এটি নিজেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ইতিহাস বলার একটি মাধ্যম। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার কোন অংশে আছেন, তার ওপর সেই গল্পও বদলে যায়। সার্বিয়ায় কারও মনে পড়ে সস্তা খাবার, টিটোর নীল ট্রেন কিংবা আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের কথা। আবার ক্রোয়েশিয়া বা স্লোভেনিয়ায় কেউ মনে করেন দমন-পীড়ন, নজরদারি ও ভয়ের কথা।
অন্যদিকে বিদেশি পর্যটকদের কাছে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুগোস্লাভিয়া—বড় বড় ব্রুটালিস্ট স্থাপনা, বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ এবং পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, যা সমাজতান্ত্রিক সেই রাষ্ট্রের প্রতি এখনো কৌতূহল তৈরি করে।
ক্রোয়েশিয়ার সবুজ-সুন্দর সমুদ্রসৈকত, স্লোভেনিয়ার হ্রদ, মন্টেনেগ্রোর গ্রামাঞ্চল, বসনিয়ার মধ্যযুগীয় ইতিহাস কিংবা বেলগ্রেডের ব্যস্ত নগরজীবন—বলকান ভ্রমণের কারণের অভাব নেই। তবে টিটোর নেতৃত্বাধীন যুগোস্লাভিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং তার পতনের পরের ঘটনাপ্রবাহ পর্যটকদের জন্য কৌতূহলের আরেকটি স্তর যোগ করেছে।
লাল, নীল ও সাদা অনুভূমিক রেখার ওপর লাল তারকা খচিত সেই বিখ্যাত যুগোস্লাভ পতাকা এখন আর কোথাও উড়ছে না। কিন্তু পর্যটনের জগতে যুগোস্লাভিয়া যেন এখনো টিকে আছে—অন্তত ইতিহাস, স্মৃতি ও পর্যটকদের কৌতূহলের জায়গায়। আর সেই ইতিহাসকে ঘিরে পর্যটনের দরজাও এখনো খোলা।