বিমানবন্দরে লাগেজ হারিয়ে যাওয়া, দেরিতে পাওয়া, চুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসব ঝুঁকি কমাতে কিছু পদক্ষেপ বা কৌশল নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে।
বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে
>> সম্ভব হলে ননস্টপ ফ্লাইট বুক করুন
ফ্লাইট ডিল ও ভ্রমণ পরামর্শবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘গোয়িং ডটকম’-এর প্রতিষ্ঠাতা স্কট কিজ বলেন, চেক-ইন করা লাগেজ নিয়ে বেশি চিন্তিত হলে ননস্টপ ফ্লাইটকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো। তা সম্ভব না হলে এমন কানেকশন বেছে নেওয়া উচিত, যেখানে পরবর্তী ফ্লাইট ধরার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে।
তার মতে, সংযোগকারী ফ্লাইটের সময় বিমান বদলের সময়ই লাগেজ হারানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি—বিশেষ করে কানেকশন খুব কম সময়ের হলে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
>> লাগেজ ও ভেতরের জিনিসপত্রের ছবি রাখুন
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের স্প্যানিশ ফর্কের ট্রাভেল এজেন্ট জো হোবান বলেন, তিনি তার ক্লায়েন্টদের লাগেজের ছবি তুলে রাখতে পরামর্শ দেন।
কারণ লাগেজ হারিয়ে গেলে বিমান সংস্থার কর্মীরা প্রথমেই জানতে চাইতে পারেন—ব্যাগটির ব্র্যান্ড কী, রং কী, আকার কেমন এবং এর ভেতরে কী কী ছিল।
তিনি আরও পরামর্শ দেন, ব্যাগে নেওয়ার জন্য যেসব জিনিস বিছানার ওপর সাজানো হয়েছে, সেগুলোরও একটি ছবি তুলে রাখা উচিত। লাগেজ হারিয়ে গেলে এতে ভেতরের জিনিসপত্রের একটি রেকর্ড পাওয়া যাবে।
>> লাগেজ ট্র্যাকিং সুবিধা ব্যবহার করুন
অনেক বিমান সংস্থার অ্যাপে এখন যাত্রীরা রিয়েল টাইমে তাদের লাগেজের অবস্থান বা স্ট্যাটাস দেখতে পারেন। কখন লাগেজ চেক-ইন হয়েছে, কখন বিমানে তোলা হয়েছে এবং কখন বিমান থেকে নামানো হয়েছে— এসব তথ্যও দেখা যায়।
>> নিজস্ব ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করুন
অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য নিজেরাও লাগেজ ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করতে পারেন। ব্যবহারকারীরা চাইলে তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ট্র্যাকিং তথ্য শেয়ার করার সুবিধাও ব্যবহার করতে পারেন। এতে বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোও রিয়েল টাইমে হারানো লাগেজ খুঁজে বের করতে আরও একটি উপায় পেতে পারে।
>> ব্যাগের ভেতরেও পরিচয়-তথ্য রাখুন
ভ্রমণবিষয়ক ভোক্তা অধিকার সংগঠন ট্রাভেলার্স ইউনাইটেডের পরামর্শ হলো, লাগেজের বাইরের ট্যাগের পাশাপাশি ভেতরেও নিজের পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য রাখুন। কারণ বাইরের ট্যাগ ছিঁড়ে বা খুলে যেতে পারে।
>> সম্ভব হলে শুধু ক্যারি-অন ব্যাগ নিন
যে লাগেজ আপনি চেক-ইনই করেননি, বিমান সংস্থা সেটি হারাতে পারবে না। ‘এএএ’ ট্রাভেল বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পলা টুইডেল যতটা সম্ভব হালকা লাগেজ নিয়ে শুধু ক্যারি-অন ব্যাগ ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
এতে বিমানবন্দর থেকে বের হতে সময় কম লাগবে এবং লাগেজ নিয়ে দুশ্চিন্তাও কম থাকবে।
>> ক্রেডিট কার্ডের ভ্রমণ সুরক্ষা সুবিধা দেখে নিন
অতিরিক্ত ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স কেনার আগে নিজের ক্রেডিট কার্ডের ভ্রমণ সুরক্ষা বা ইনস্যুরেন্স সুবিধা পরীক্ষা করে দেখতে বলেন স্কট কিজ।
বিমান সংস্থা যে ক্ষতিপূরণ দেয় না, তার কিছু অংশ ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা থেকে পাওয়া যেতে পারে। শুধু হারানো লাগেজ নয়, লাগেজের জন্য অপেক্ষা করার সময় প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে হলে তার খরচও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফেরত পাওয়া যেতে পারে।
>> লাগেজ আলাদাভাবে পাঠানো
স্কট কিজের মতে, কিছু পরিস্থিতিতে লাগেজ আলাদাভাবে পাঠানোও ভালো বিকল্প হতে পারে।
প্রথমত, আপনি যদি এক মাস বা তার বেশি সময় কোনো জায়গায় থাকার পরিকল্পনা করেন এবং অনেক জিনিস সঙ্গে নিতে চান। সেক্ষেত্রে লাগেজ আলাদাভাবে পাঠালে বেশি জিনিস নেওয়া যায় এবং অনেক সময় খরচও কম হতে পারে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে ভারী ব্যাগ বহন করার ঝামেলা থাকে না এবং দরজা থেকে দরজা পর্যন্ত ডেলিভারি পাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত গন্তব্যে যাওয়ার আগে যদি একাধিক ছোট স্টপওভার থাকে এবং সেখানে দীর্ঘ সময় থাকার পরিকল্পনা থাকে। সে ক্ষেত্রে ছোট যাত্রাগুলোতে ক্যারি-অন ব্যাগ ব্যবহার করে বড় লাগেজটি সরাসরি চূড়ান্ত গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
ফ্লাইটে ওঠার আগে বিমানবন্দরে
>> সময়মতো লাগেজ চেক-ইন করুন
একেবারে শেষ মুহূর্তে লাগেজ চেক-ইন করা ঠিক নয়। এতে সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কারণ লাগেজ যখন কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে যাচ্ছে এবং এর মধ্যে নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য সেটি বাছাই করা হলে, সামান্য দেরিও বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
>> মূল্যবান জিনিস ক্যারি-অন ব্যাগে রাখুন
অনেকেই যাত্রীদের গহনা বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস সঙ্গে কেবিনে রাখার পরামর্শ দেয়।
এসব জিনিস কখনোই চেক-ইন করা লাগেজে রাখা উচিত নয়।
>> লাগেজ ট্যাগের গন্তব্য পরীক্ষা করুন
বিশেষ করে কার্বসাইড চেক-ইন করলে লাগেজের ট্যাগে লেখা গন্তব্য ঠিক আছে কি না তা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
এছাড়া লাগেজের ক্লেইম টিকিট বা রসিদ নিরাপদ জায়গায় রাখুন।
>> লাগেজ দেরিতে এলে
অন্য লাগেজ ক্যারোসেলও দেখে নিন
আপনার লাগেজ নির্ধারিত বেল্টে না এলে কাছাকাছি অন্য লাগেজ ক্যারোসেলগুলোও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ট্রাভেল পরামর্শবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘দ্য পয়েন্টস গাই’ এমন পরামর্শ দিয়েছে।
সেখানেও না পেলে বিমান সংস্থার লাগেজ অফিসে যোগাযোগ করুন। এ সময় আগে থেকে ব্যবহার করা ট্র্যাকিং অ্যাপ বা ডিভাইসও কাজে লাগতে পারে।
লাগেজ না এলে দ্রুত বিমান সংস্থাকে বিষয়টি জানান।
অনেক সময় বিমান সংস্থার কর্মীরা জানাতে পারেন যে লাগেজটি খুঁজে পাওয়া গেছে, কিন্তু পরবর্তী ফ্লাইটে আসায় কিছুটা দেরি হবে। অপেক্ষা করার সময় থাকলে অপেক্ষা করতে পারেন। সময় না থাকলে বিমানবন্দরেই হারানো লাগেজ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরণ করুন।
>> বিমান সংস্থাকে লাগেজ পৌঁছে দিতে বলুন
বিমান সংস্থা যদি আপনার লাগেজ খুঁজে পায় কিন্তু সেটি পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, তাহলে আপনি যেখানে থাকবেন সেই ঠিকানা তাদের দিন এবং তাদের ডেলিভারি সার্ভিস ব্যবহার করতে বলুন।
>> সব রসিদ সংরক্ষণ করুন
লাগেজ ছাড়া কয়েক দিন চলার জন্য যদি নতুন সাঁতারের পোশাক, টুথপেস্ট বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়, তাহলে প্রতিটি কেনাকাটার রসিদ রেখে দিন।
পরে ক্ষতিপূরণ বা খরচ ফেরত পাওয়ার জন্য এসব রসিদ প্রয়োজন হতে পারে।
লাগেজ হারিয়ে গেলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা চুরি হলে
>> বিমান সংস্থার ক্ষতিপূরণ নীতি দেখুন
প্রতিটি বিমান সংস্থার ওয়েবসাইটে লাগেজ হারিয়ে গেলে কী করতে হবে এবং কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে তথ্য থাকার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিমান সংস্থাগুলোরও নিজস্ব নিয়ম ও প্রক্রিয়া রয়েছে।
>> বিমান সংস্থা সহযোগিতা না করলে
বিমান সংস্থা ক্ষতিপূরণ দিতে অযথা দেরি করলে বা সহযোগিতা না করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে দেশটির পরিবহন বিভাগের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও কানাডার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার ব্যবস্থা রয়েছে।
>> ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা
নিয়ম, ব্যতিক্রম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নানা শর্ত থাকলেও হারানো লাগেজের জন্য শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে দেশটির পরিবহন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী বিমান সংস্থার দায়বদ্ধতার সর্বোচ্চ সীমা ৪,৭০০ ডলার। বিমান সংস্থা চাইলে এর চেয়ে বেশি দিতে পারে, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা প্রায় ২,১৭৫ ডলার।
লাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে
বিমানবন্দরেই যদি দেখেন আপনার লাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে সেখানেই বিষয়টি বিমান সংস্থাকে জানান।
তবে ভুলভাবে প্যাক করার কারণে কোনো জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমান সংস্থাকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয় না। একইভাবে ভঙ্গুর জিনিস, ইলেকট্রনিকস, নগদ অর্থ ও পচনশীল পণ্যের মতো কিছু নির্দিষ্ট জিনিসের ক্ষতির দায়ও বিমান সংস্থার ওপর নাও থাকতে পারে।
অন্যদিকে লাগেজের চাকা, হাতল ও স্ট্র্যাপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমান সংস্থার দায় থাকতে পারে।
লাগেজ ইন্স্যুরেন্স
সাধারণভাবে লাগেজ ইন্স্যুরেন্সকে দুটি বড় ভাগে দেখা যায়—লাগেজ দেরিতে পৌঁছানো এবং লাগেজ হারিয়ে যাওয়া।
তাই ভ্রমণের আগে আপনার বিমান সংস্থা, ক্রেডিট কার্ড এবং ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্সে লাগেজ সংক্রান্ত কী ধরনের সুরক্ষা রয়েছে, তা ভালোভাবে জেনে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।