১৮৮৬ সালের ৮ মে মার্কিন ফার্মাসিস্ট জন স্টিথ পেমবার্টনের হাত ধরে কোকা-কোলার যে বিপ্লব শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বজুড়ে এক অবিসংবাদিত নাম। কিউবা, উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়া ছাড়া পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই কোকের দেখা মেলে। তবে এই দেশগুলোও নাগরিকদের কোলার চাহিদা মেটাতে স্থানীয় বিকল্প তৈরি করে নিয়েছে।
সিএনএনের ফিচারধর্মী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বহু উদ্যোক্তা, গবেষক এমনকি সরকারও স্থানীয় উপাদান ও অভিনব ফর্মুলা দিয়ে আঞ্চলিক কোলা তৈরি করেছেন, যা ক্লাসিক কোলার মতো ফেনা তুললেও স্বাদে সম্পূর্ণ আলাদা। এই পানীয়গুলোর মধ্যে বেশ কিছু কোলা আজও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে।
এর মধ্যে একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো চেক প্রজাতন্ত্রের ‘কোফোলা’। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ায় পুঁজিবাদী পশ্চিমের কোলার সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য এই পানীয় তৈরির সরকারি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
১৪টি ভেষজ ও ফলের নির্যাস, ক্যাফেইন এবং গোপন উপাদানের মিশ্রণে তৈরি কোফোলা দেখতে অবিকল কোকের মতো হলেও এর স্বাদ কিছুটা ভেষজ। কোকের চেয়ে এতে ৩০ শতাংশ কম চিনি রয়েছে এবং কোনো ফসফরিক অ্যাসিড নেই।
ঠিক একইভাবে, যুগোস্লাভিয়ার লিউব্লজানা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক এমেরিক জেলিংকার হাত ধরে ১৯৫২ সালে আত্মপ্রকাশ করে স্লোভেনিয়ার ‘কোকটা’। ডালিম, লেবু এবং কমলাসহ ১১টি ভেষজ ও মসলার ক্যাফেইনমুক্ত মিশ্রণ থেকে আসা টক ও ফুলের সুবাস নতুন ভক্তদের আকৃষ্ট করে। এটি লাল ওয়াইনের সাথে মিশে স্থানীয়ভাবে ‘বাম্বুস’ নামে দারুণ জনপ্রিয় এক পানীয় তৈরি করে।
আফ্রিকা ও এশিয়ার স্থানীয় উপাদানগুলোও এই কোলা বাজারে বিপ্লব এনেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাইজেরিয়ায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে চালু হওয়া ‘ওজাজা কোলা’র সাথে আধ্যাত্মিক ও রাজকীয় শেকড় জড়িত।
ইফে-এর ৫১তম ওওনি এবং ইওরুবা জনগণের আধ্যাত্মিক নেতা ওওনি আদেইয়েদে এনিতান ওগুনওয়ুসি ওজাজা দ্বিতীয় এটি তৈরি করেছেন। শতভাগ দেশীয় উপাদান ও আসল কোলা নাট থেকে তৈরি এই পানীয় জাতীয় গৌরব ও শিল্পায়নের প্রতীক। অন্যদিকে, জাপানের ক্ষুদ্র কিকাইজিমা দ্বীপে তৈরি ‘টোবা টবা কোলা’ কোলা নাটের সাথে দ্বীপটির নিজস্ব সাইট্রাস ফল শিইকু এবং ১৪টি মসলার মিশ্রণে তৈরি একটি বহুমুখী কোলা সিরাপ, যা চা, দুধ বা ওয়াইনের সাথে দারুণভাবে মিশে যায়।
আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারেও রয়েছে নানা ইতিহাস সমৃদ্ধ কোলা। ১৯ শতকের ভারতে ব্রিটিশ লর্ড উইলিয়াম কানিংটনের তৈরি টনিক জলের ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনায় যাত্রা শুরু করে ‘কানিংটন কোলা’, যা স্থানীয়ভাবে ‘ফার্নান্ডিটো’ তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত হয়। কানাডার টরন্টোতে ইতালীয় অভিবাসীদের নস্টালজিয়া থেকে ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া ‘ব্রায়ো চিনোটো’ সাইট্রাস ফলের টক-মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত। এছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যসচেতনতার যুগে অস্ট্রেলিয়ার ‘ববি কোলা’ প্রিবায়োটিক যুক্ত করে, চিনি ও ক্যালোরি কমিয়ে এবং প্রিজারভেটিভ বর্জন করে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ফোকাস রেখে ২০২৩ সালে ব্রিটিশ উদ্যোক্তা আইকিজ শাহের হাতে তৈরি হালাল-প্রত্যয়িত ‘সালাম কোলা’ অল্প সময়েই ৩৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যার লাভের একটি অংশ দাতব্য কাজে ব্যয় করা হয়। বৈশ্বিক কোলার এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে মানুষের কোলার প্রতি অনুরাগ কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িত।