সুইডিশ সংস্কৃতিতে সমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সাধারণত অহংকার বা নিজের সাফল্য জাহির করা পছন্দ করেন না এবং অন্যদের চেয়ে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরতেও অনাগ্রহী।
অথচ একই সঙ্গে সুইডিশরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেন এবং উৎসব-আনন্দ উদযাপনেও পিছিয়ে নেই। এই আপাত-বিরোধী বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে প্রায় একশ বছরের পুরোনো একটি ধারণা— `জান্তের আইন’ গুরুত্বপূর্ণ।
ধারণাটি আসে ড্যানিশ-নরওয়েজিয়ান লেখক অ্যাক্সেল স্যান্ডেমোসের ১৯৩৩ সালের ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস ‘আ ফাগিটিভ ক্রসেস হিস ট্র্যাকস’ থেকে। কাল্পনিক জান্তে শহরকে কেন্দ্র করে লেখা বইটিতে ছোট শহরের সামাজিক অনুকরণপ্রবণতা ও একরকম মানসিক চাপকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। সেখানে ১০টি ‘আইন’-এর মাধ্যমে বলা হয়— কেউ যেন নিজেকে বিশেষ মনে না করে, অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান না ভাবে বা নিজেকে অন্যদের ওপরে না রাখে।
আজকের সুইডিশ সমাজে অবশ্য এগুলো কোনো আক্ষরিক নিয়ম নয়। মিড সুইডেন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক স্টেফান ডালবার্গের মতে, এগুলো বরং এমন কিছু সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা দৈনন্দিন সামাজিক আচরণে দেখা যায়।
সামাজিক মর্যাদার পার্থক্যকে ছোট করে দেখা, অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং প্রকাশ্য আত্মপ্রচারকে নেতিবাচকভাবে দেখা—এসব তারই অংশ।
যেমন, কোনো সুইডিশ ব্যক্তির ইংরেজির প্রশংসা করলে তিনি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে তা খাটো করে বলবেন, ‘আমার ইংরেজি তো খুব সাবলীল নয়।’ নিজের প্রশংসা গ্রহণ না করার এই প্রবণতাও জান্তের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ‘ফ্রেদাগসমিস’ হলো পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে অনাড়ম্বরভাবে শুক্রবার সন্ধ্যা কাটানোর ঐতিহ্য।
আবার ‘লর্দাগসগোদিস’ বা ‘শনিবারের মিষ্টি’ হলো সপ্তাহজুড়ে সংযমের পর শনিবার শিশুদের মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ দেওয়ার একটি জনপ্রিয় রীতি।
তবে জান্তের আইন শুধু নিজেকে ছোট করে দেখার বিষয় নয়। এর আরেকটি অর্থ হলো, কেউ ধনী, সফল বা উচ্চপদস্থ হলেই যে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ সমতার ধারণাটি একই সঙ্গে অন্যকে এবং নিজেকেও অতিরিক্ত উচ্চতায় বসাতে নিরুৎসাহিত করে।
এই সংযত সামাজিক আচরণ পার্টিতে আবার অনেকটাই বদলে যেতে পারে। ‘স্ন্যাপসভিসর’ নামের পানীয়কেন্দ্রিক গান, প্রাণবন্ত বক্তৃতা ও উৎসবের পরিবেশে সুইডিশরা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন।
বড়দিন, ইস্টার, মিডসামার, জন্মদিন কিংবা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সমাপ্তিও সুইডেনে বেশ উৎসাহের সঙ্গে উদযাপিত হয়।
সুইডিশদের এই সংযম শুধু সামাজিক আচরণে নয়, স্থাপত্য ও জীবনযাপনেও দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গ্রীষ্মকালীন বাড়িগুলো সাধারণত আড়ম্বরপূর্ণ নয়; বরং প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষের কোনো না কোনোভাবে এমন গ্রীষ্মকালীন বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্বের অধ্যাপক অরভার লোফগ্রেন।
তাই সুইডিশদের নীরবতা বা সংযমকে কেবল শীতলতা হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। এটি অনেক ক্ষেত্রে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান এবং সামাজিক সমতার প্রতি গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ। আর সেই কারণেই সুইডিশ সংস্কৃতিকে বুঝতে ‘জান্তের আইন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চাবিকাঠি।