একসময় যুদ্ধ, ধ্বংস ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটকদের কাছে অনাকর্ষণীয় ছিল ইরাক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় তীর্থস্থান, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এবং খ্রিষ্টান ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে দেশটি নতুনভাবে পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। কারবালা ও নাজাফের বিপুল তীর্থযাত্রার পাশাপাশি উর, মসুল ও মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন নিদর্শন এখন আন্তর্জাতিক ভ্রমণপিপাসুদেরও আকর্ষণ করছে।

দক্ষিণ ইরাকের প্রাচীন নগরী উর দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। ঐতিহ্যগতভাবে স্থানটি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্মস্থান বা আদি বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। নাসিরিয়াহ শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত উরের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো।

উরের প্রাচীন জিগুরাট এবং ‘আব্রাহামের ভূমি’ হিসেবে ধর্মীয় পরিচিতি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ২০২১ সালে পোপ ফ্রান্সিস ঐতিহাসিক এই স্থান সফর করেন। এরপর আন্তর্জাতিক পর্যটন অঙ্গনে উর নিয়ে আগ্রহ আরও বাড়ে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইরাক ও ভ্যাটিকানের মধ্যে উরকে কেন্দ্র করে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রা সম্প্রসারণের উদ্যোগের খবরও প্রকাশিত হয়।

তবে ইরাকের ধর্মীয় পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি শিয়া তীর্থযাত্রা। কারবালায় সফর মাসের ২০ তারিখে অনুষ্ঠিত আরবাইন বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটি। গত বছর এই আয়োজনে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে আল-আব্বাস মাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এ বছর আরবাইনে কারবালায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ তীর্থযাত্রী বিশ্বের ১৭২টি দেশ থেকে এসেছেন। এই বিপুল মানুষের যাত্রাকে ঘিরে স্থানীয় হোটেল, পরিবহন, খাবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে বাড়ে।

তীর্থযাত্রীদের যাত্রাপথে স্বেচ্ছাসেবীদের পরিচালিত মাওকিব বা অস্থায়ী সেবাকেন্দ্রে বিনা মূল্যে খাবার, পানি, বিশ্রাম ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে ধর্মীয় এই আয়োজন ইরাকের পর্যটন ব্যবস্থাপনার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

তবে পর্যটন খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে নাজাফে ইরানি তীর্থযাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন যেখানে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার ইরানি তীর্থযাত্রী আসতেন, তা কমে ১০০ থেকে ২৫০ জনে নেমে আসে।

তারপরও ইরাকের সম্ভাবনা স্পষ্ট। আধুনিক ই-ভিসা ব্যবস্থা, ধর্মীয় তীর্থস্থান এবং সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য দেশটিকে নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরছে। কারবালার আধ্যাত্মিকতা, উরের প্রাচীন ইতিহাস, মসুলের খ্রিষ্টান ঐতিহ্য এবং মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার নিদর্শন মিলিয়ে ইরাক ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় ভ্রমণপথ তৈরি করছে।