প্রায় ৩০ বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার সোনোমা অঞ্চলের একটি অংশ শাসন করেছিল জারশাসিত রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাশিয়ার এই উপনিবেশের কথা আজ অনেকেরই অজানা। খবর: বিবিসি।
সান ফ্রান্সিসকো থেকে উত্তরে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। গোল্ডেন গেটের কুয়াশা পেরিয়ে পোড়া রোদে শুকিয়ে যাওয়া আঙুরের বাগানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে পৌঁছানো যায় প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী দুর্গম এলাকায়। এখানেই রয়েছে ফোর্ট রস—রুশ ভাষায় কৃপোস্ত রস। সমুদ্রের দিকে তাকালে নিচে ফেনিল ঢেউয়ের মধ্যে পাথরের ওপর বসে থাকা সিল মাছের ডাক শোনা যায়। অন্যদিকে খাড়া পাহাড় আর বিশাল রেডউড গাছ ঘিরে রেখেছে রাস্তা।
হঠাৎ নীল সমুদ্রের পটভূমিতে দেখা যায় দুটি গম্বুজ ও অর্থোডক্স ক্রসযুক্ত একটি ছোট্ট গির্জা। এর পাশ দিয়ে সাইরিলিক লেখা একটি সাইনবোর্ড অনুসরণ করে এগোলে পাওয়া যায় কাঠের তৈরি পুরোনো দুর্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪৬ মিটার উঁচু পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটিই ফোর্ট রস।
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পার্কসের প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্রিস কিমসি বলেন, “ফোর্ট রসে স্বাগতম—এটি ছিল রুশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্ত।”
প্রতি বছর লাখো পর্যটক প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রতীর ঘুরে দেখেন। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না, সান ফ্রান্সিসকো থেকে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার উত্তরে একসময় রুশ সাম্রাজ্যের একটি উপনিবেশ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ জানেন, আলাস্কা প্রায় ৭০ বছর রাশিয়ার অংশ ছিল। কিন্তু রুশ সাম্রাজ্যের একমাত্র স্থায়ী বিদেশি উপনিবেশ ‘রাশিয়ান আমেরিকা’ যে ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সে কথা খুব কম মানুষই জানেন। এমনকি সদ্য স্বাধীন আমেরিকানদের আগেই রুশরা ক্যালিফোর্নিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিল।
‘রস’ নামটি রাশিয়ার রুশ নাম ‘রসিয়া’ থেকে এসেছে। ফোর্ট রসের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলাস্কার রুশ বসতিগুলোর জন্য খাদ্য উৎপাদন করা। তবে পরে এটি উত্তর আমেরিকায় রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার ক্যালিফোর্নিয়া অভিযান
১৫০০ ও ১৬০০-এর দশকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছিল, রাশিয়া তখন পূর্বদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ১৬৪০-এর দশকের মধ্যে রুশ পশম ব্যবসায়ী ও ভাড়াটে যোদ্ধারা সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছে যায়।
আলাস্কায় রুশ বসতি স্থাপনের পর ১৭৯৯ সালে জার পল প্রথম ‘রাশিয়ান-আমেরিকান কোম্পানি’কে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আদলে তৈরি এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পশম ব্যবসার পাশাপাশি আলাস্কার ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
তবে সমস্যা ছিল—আলাস্কার হিমশীতল পরিবেশে কৃষিকাজ করা কঠিন হওয়ায় রুশ উপনিবেশবাসীরা খাদ্যসংকটে পড়ছিলেন। তাই উষ্ণ আবহাওয়া ও স্প্যানিশ বাণিজ্যিক অংশীদারের সন্ধানে তারা দক্ষিণে এগিয়ে আসে।
১৮০৬ সালে রাশিয়ান-আমেরিকান কোম্পানির পরিচালক নিকোলাই রেজানভ ক্ষুধার্ত আলাস্কান উপনিবেশবাসীদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরে পৌঁছান। ছয় সপ্তাহ সেখানে থাকার সময় তিনি স্প্যানিশদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করেন। পরে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলকে প্রায় অরক্ষিত এবং আলাস্কার তুলনায় অনেক উষ্ণ দেখে সেখানে রুশ উপনিবেশ স্থাপনের পরিকল্পনা করেন।
১৮১২ সালে ২৫ জন রুশ এবং ৮০ জন স্থানীয় আলাস্কান শিকারি বর্তমান সোনোমা কাউন্টির সমুদ্রতীরে বসতি স্থাপন করেন। রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি এই বসতিতে উড়তে থাকে জারের দ্বিমুখী ঈগল প্রতীকযুক্ত পতাকা।
বহুজাতিক এক উপনিবেশ
১৮৩০-এর দশকে ফোর্ট রসের জনসংখ্যা প্রায় ৪০০-তে পৌঁছায়। ফলে এটি ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম বৈচিত্র্যময় বসতিতে পরিণত হয়। আলেউশিয়ান ও কোডিয়াক শিকারিরা স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিওক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস করতেন। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে।
দুর্গের ভেতরে রুশ সৈন্য, কর্মকর্তা ও কোম্পানির কর্মীরা থাকতেন। ১২ ফুট উঁচু কাঠের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দুর্গে কামানও ছিল। যদিও স্প্যানিশ আক্রমণ ঠেকানোর জন্য এটি তৈরি হয়েছিল, রুশ ও স্প্যানিশদের মধ্যে কখনো সরাসরি সংঘর্ষ হয়নি। বরং উভয় পক্ষ প্রয়োজনীয় পণ্য পেতে একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করত।
ফোর্ট রসে একসময় প্রায় ৬০টি ভবন ছিল। সেখানে গির্জার পাশাপাশি বেকারি, স্নানাগার এবং নানা ধরনের কারখানা গড়ে ওঠে। এখানেই ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম সমুদ্রযাত্রার উপযোগী জাহাজ নির্মাণ করা হয়। ইট, কাচ ও উইন্ডমিল তৈরির ক্ষেত্রেও রুশদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
কৃষিক্ষেত্রেও তারা রেখে যায় বড় প্রভাব। ১৮১৭ সালে রুশরা বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে প্রথম আঙুরের চাষ শুরু করে। পরে এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ওয়াইন শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তবে শেষ পর্যন্ত ফোর্ট রস তার দুটি প্রধান লক্ষ্য—লাভজনক হওয়া এবং আলাস্কার রুশ বসতিগুলোকে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ—কোনোটিই পূরণ করতে পারেনি। অতিরিক্ত শিকারের কারণে স্থানীয় সি-অটার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। আবার কুয়াশা ও ইঁদুরের কারণে কৃষি উৎপাদনও প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল।
১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত হাডসনস বে কোম্পানি রুশ আলাস্কাকে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ শুরু করলে ফোর্ট রসের গুরুত্ব দ্রুত কমতে থাকে। ১৮৪১ সালে সুইস অভিবাসী জন সাটার ৩০ হাজার ডলারে ফোর্ট রসের ভবন ও সম্পদ কিনে নেন।
রুশরা ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে চলে গেলেও তাদের স্মৃতি আজও টিকে আছে। সান ফ্রান্সিসকোর ‘রাশিয়ান হিল’ নামটি রুশ নাবিকদের কবর আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত। বডেগা বে-তেও রুশ উপস্থিতির স্মারক রয়েছে। আর রাশিয়ান রিভার ভ্যালি এখন প্রতি বছর লাখো মানুষকে আকর্ষণ করে।
স্থানীয় কাশায়া পোমো জনগোষ্ঠীর বংশধরদের কাছে ফোর্ট রসের ইতিহাস আরও পুরোনো। রুশরা আসার আগে এই জায়গাটি হাজার হাজার বছর ধরে ‘মেতিনি’ নামে একটি মৌসুমি মাছ ধরার গ্রাম ছিল।
আজ প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা ফোর্ট রস ক্যালিফোর্নিয়ার সেই বিস্মৃত রুশ অধ্যায়ের নীরব স্মারক। একটি ছোট্ট অংশ যে একসময় রাশিয়ার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল—ইতিহাসের এই বিস্ময়কর অধ্যায়ই ফোর্ট রসকে আজও বিশেষ করে রেখেছে।