তিব্বতের দুর্গম মালভূমিতে বরফঢাকা পর্বত, বিস্তীর্ণ পাথুরে প্রান্তর আর গভীর নীল হ্রদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম অনন্য তীর্থ ও ভ্রমণগন্তব্য কৈলাস-মানস সরোবর। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এই অঞ্চল ভ্রমণপিপাসুদেরও আকর্ষণ করে। তবে মনোমুগ্ধকর এই যাত্রাপথ যেমন সুন্দর, তেমনি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।

কৈলাস পর্বত তিব্বতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার। কাছেই রয়েছে মানস সরোবর, যা বিশ্বের উচ্চতম মিঠা পানির হ্রদগুলোর অন্যতম। চারপাশের তুষারঢাকা শৃঙ্গ, শুষ্ক মালভূমি ও নীল জলরাশির বৈপরীত্য এই অঞ্চলকে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে।

চার ধর্মের কাছে পবিত্র

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে কৈলাসকে ভগবান শিবের আবাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৌদ্ধ, জৈন ও তিব্বতি বোন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পর্বতটির বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে।

এ কারণে অধিকাংশ তীর্থযাত্রী কৈলাসের চূড়ায় আরোহণের পরিবর্তে পর্বতটিকে ঘিরে পরিক্রমা করেন। এই পথ, যা কোরা নামেও পরিচিত, প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সাধারণত তিন দিনে সম্পন্ন করা হয়।

কেন এত কঠিন এই সফর?

কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চতা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি। কম অক্সিজেন, তীব্র ঠান্ডা, দীর্ঘ পথ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া ভ্রমণকে শারীরিকভাবে কঠিন করে তোলে।

কৈলাস পরিক্রমার দ্বিতীয় দিনটি সবচেয়ে কঠিন বলে বিবেচিত। এ সময় প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতার দোলমা লা পাস অতিক্রম করতে হয়। তাই পর্যাপ্ত শারীরিক প্রস্তুতি এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতা সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কোন পথে যাওয়া যায়?

ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস ও সিকিমের নাথু লা দিয়ে যাত্রার ব্যবস্থা রয়েছে। নেপাল হয়েও তিব্বতে প্রবেশের বিভিন্ন বেসরকারি রুট ব্যবহৃত হয়। কাঠমান্ডু থেকে সড়কপথে অথবা নেপালগঞ্জ-সিমিকোট হয়ে হেলিকপ্টার ও সড়কপথ মিলিয়ে যাত্রার সুযোগ রয়েছে। রুটভেদে সময়, অনুমতি ও খরচে পার্থক্য হয়।

তবে বর্তমানে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রুটগুলো নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জরুরি। আগস্টের শেষ সপ্তাহে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সীমান্ত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কৈলাসগামী বহু তীর্থযাত্রী ও পর্যটকের যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার ও পরিস্থিতি মূল্যায়নের কাজ চলছে।

যাওয়ার আগে যা জানা জরুরি

এই সফরে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রের মতো সুবিধা সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই অনুমতি, ভিসা ও সীমান্তসংক্রান্ত নিয়ম আগে থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। সঙ্গে উপযুক্ত গরম পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জরুরি সরঞ্জাম রাখা উচিত।

কৈলাস-মানস সরোবরের আকর্ষণ শুধু গন্তব্যে নয়, পথের প্রতিটি দৃশ্যেও। তবে এই যাত্রা সফল ও নিরাপদ করতে ভক্তি বা ভ্রমণের আগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজন যথেষ্ট প্রস্তুতি, ধৈর্য এবং সর্বশেষ সরকারি ভ্রমণ নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতনতা।