ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটকদের শিগগিরই নতুন কর দিতে হতে পারে। দেশটির সরকার ঘোষণা করেছে, স্থানীয় মেয়রদের রাতযাপনের জন্য আসা পর্যটকদের কাছ থেকে ‘ভিজিটর লেভি’ বা পর্যটন কর নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
এই করের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো আবাসনে রাতযাপনের মোট খরচের ৫ শতাংশের কম হতে পারে এই কর।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পর্যটন কর চালু রয়েছে। এমনকি স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরাতেও জুলাই থেকে রাতযাপনের ওপর পর্যটন কর চালু হয়েছে। তবে ইংল্যান্ডে এই ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে দেশটির হসপিটালিটি বা আতিথেয়তা খাত।
বিরোধীদের দাবি, নতুন কর পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করবে এবং এমন একটি খাতের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে, যা এরই মধ্যে কর বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত নানা সমস্যার মুখোমুখি।

ইংল্যান্ডের নতুন পর্যটন কর সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের মেয়ররা পর্যটকদের রাতযাপনের মোট খরচের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে কর নিতে পারবেন।
এই কর সব ধরনের পর্যটন আবাসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে হোটেল, হলিডে রেন্টাল, বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট (বিঅ্যান্ডবি) এবং গেস্টহাউস।
পর্যটক কোন দেশের নাগরিক কিংবা কী উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন—এসব বিবেচনা না করেই সবার কাছ থেকে এই কর নেওয়া হবে।
মেয়ররা নিজেদের এলাকায় করের হার নির্ধারণ করতে পারবেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, রাতযাপনের বিলের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যে এটি রাখা হবে। লন্ডনসহ বেশ কয়েকটি এলাকার মেয়র ইতোমধ্যে এই সীমার মধ্যেই কর রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কোন কোন এলাকায় এই কর চালু হবে, সেটিও মেয়রদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে কিছু এলাকা ইতোমধ্যে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র স্কেগনেস এবং হার্টলপুল শহর।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের শেষ হওয়ার আগেই এসব পর্যটন কর চালু হতে পারে।

ইংল্যান্ডের পর্যটন কর কি পর্যটক কমিয়ে দেবে?
নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ইংল্যান্ডের হসপিটালিটি খাতে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
খাতটির বাণিজ্যিক সংগঠন ‘ইউকেহসপিটালিটির’ হিসাব বলছে, ৫ শতাংশ পর্যটন কর চালু হলে ২০৩০ সালে পর্যটকদের রাতযাপনের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ কমতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতে ব্যয় কমতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা (১৮০ কোটি পাউন্ড)।
সংগঠনটির পূর্বাভাস, এর ফলে প্রায় ৩৩ হাজার কর্মসংস্থানও হারিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো, যেসব গন্তব্যে পর্যটন কর থাকবে, পর্যটকেরা সেসব জায়গা বাদ দিয়ে এমন গন্তব্য বেছে নিতে পারেন যেখানে এই কর নেই।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি) সতর্ক করেছে, নতুন এই কর বিশ্ব পর্যটন গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
সংস্থাটির চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় তিন আন্তর্জাতিক পর্যটক উৎস— যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানির ২৯ শতাংশ পর্যটক বলেছেন, ১০ ইউরো (প্রায় ১,৪৩১ টাকা) পর্যটন কর চালু হলে তারা বিকল্প কোনো গন্তব্য বেছে নেওয়ার কথা ভাববেন অথবা যুক্তরাজ্য সফর বাতিল করতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের মধ্যেও ৩৯ শতাংশ বলেছেন, ১০ পাউন্ড (প্রায় ১,৬৬৮ টাকা) কর দিতে হলে তারা দেশের বাইরে ছুটি কাটানোর কথা ভাববেন অথবা যুক্তরাজ্যেই ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা বাদ দিতে পারেন।

যুক্তরাজ্যের কোথায় ইতোমধ্যে পর্যটন কর চালু আছে?
যুক্তরাজ্যে পর্যটন কর তুন কোনো বিষয় নয়।
চলতি গ্রীষ্মে এডিনবরা শহর রাতযাপনের জন্য নেওয়া সব ধরনের অর্থের ওপর ৫ শতাংশ কর চালু করেছে।
এই কর টানা সর্বোচ্চ পাঁচ রাতের জন্য নেওয়া হবে এবং বছরের প্রতিটি দিন একই হারে প্রযোজ্য থাকবে।
২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম শহর হিসেবে ম্যানচেস্টার পর্যটন কর চালু করে। সেখানে প্রতি কক্ষ, প্রতি রাতের জন্য প্রায় ১৬৭ টাকা (১ পাউন্ড) কর নেওয়া হয়। শহরের কেন্দ্রের যেসব হোটেল ও স্বল্পমেয়াদি সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্টের বার্ষিক ভাড়া মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা (৭৫ হাজার পাউন্ড) বা তার বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই কর প্রযোজ্য।
অন্যদিকে ওয়েলসে স্থানীয় সরকারগুলো ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি ব্যক্তি, প্রতি রাতের জন্য সর্বোচ্চ প্রায় ২১৭ টাকা (১.৩০ পাউন্ড) পর্যটন কর নিতে পারবে।
ফলে ইংল্যান্ডের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাজ্যে রাতযাপনের ওপর পর্যটন কর আরও বিস্তৃত হতে পারে।