ভ্রমণের ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরেই জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা, চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করা এবং এমন সব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, যেগুলোর দেখা হয়তো অন্যভাবে কখনোই মিলত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা সবকিছু দেখার ও অভিজ্ঞতা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।
এটাই ‘বাকেট লিস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’-এর গল্প গত দুই দশকে এটি কীভাবে আমাদের ভ্রমণের ধরন বদলে দিয়েছে।
ভ্রমণ লেখক স্যাম ফেয়ারলে শনিবার ফারআউট সাময়িকীতে লিখেছেন, ‘বাকেট লিস্ট’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ‘ম্যানডেলা ইফেক্ট’-এর উদাহরণ। মনে হয়, শব্দটি যেন আমরা সারা জীবন ধরে শুনে আসছি। হয়তো উইলিয়াম শেকসপিয়ারের লেখাতেও ছিল! অথচ ধারণা করা হয়, শব্দটি হাল আমলে চিত্রনাট্যকার জাস্টিন জ্যাকহ্যাম তৈরি করেন। মৃত্যুর আগে তিনি যেসব কাজ করতে চান, সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন।
তিনি পুরোনো ব্রিটিশ প্রবাদ ‘কিক দ্য বাকেট’ থেকে নিজের তালিকার নাম দেন, ‘লিস্ট অব দ্য থিংস টু ডু বিফর আই কিক দ্য বাকেট’। পরে সেটিকে সংক্ষেপ করে নাম দেন ‘জাস্টিনস বাকেট লিস্ট’।
পরবর্তী সময়ে তিনি এটাকে চিত্রনাট্যে রূপ দেন। ২০০৭ সালে জ্যাক নিকোলসন ও মর্গান ফ্রিম্যান অভিনীত সিনেমা ‘দ্য বাকেট লিস্ট’ মুক্তি পায়। মাত্র পাঁচ বছর পর শব্দটি অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতেও জায়গা করে নেয়।
মানুষ সবসময়ই জীবনের শেষ হওয়ার আগে কিছু লক্ষ্য ও স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছে। তবে ‘বাকেট লিস্ট’ শব্দটি সেই অস্পষ্ট ধারণাকে একটি নির্দিষ্ট রূপ দেয়। নতুন ভাষা শেখা, বাড়ি কেনা কিংবা ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার মতো ব্যক্তিগত লক্ষ্য যেমন বাকেট লিস্টে থাকতে পারে, তেমনি এর বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ভ্রমণ।
নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে নতুন জায়গা দেখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের বহু পুরোনো। তবে গত শতাব্দীতে বিমান ভ্রমণের প্রসারের ফলে এটি প্রায় সবার নাগালের মধ্যে চলে আসে। ভ্রমণ আমাদের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনকে বদলে দিতে পারে। তাই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ভ্রমণ।
কিন্তু এর ফলও হয়েছে। অনেক গন্তব্য এখন উপভোগ, বোঝা ও আবিষ্কারের জায়গা না হয়ে কেবল ‘বাক্সে টিক দেওয়ার’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ছবি তুলে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করাই যেন সেখানে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য।
মাচু পিচু পুনরাবিষ্কারের পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরোয়নি। অথচ আন্দিজ পর্বতমালার এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন ‘বাকেট লিস্ট’-এর অন্যতম আবশ্যিক গন্তব্য। এর ইতিহাস ও প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবির পটভূমি হিসেবে এর আধুনিক পরিচিতি অস্বীকার করার উপায় নেই।
আধুনিক বিশ্বের বাকি ছয়টি ‘নতুন সপ্তাশ্চর্য’-এর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কারও হয়তো সেসব স্থানের ইতিহাস বা সংস্কৃতির প্রতি তেমন আগ্রহ নেই, তবুও সেখানে যাওয়া যেন জীবনের অবশ্যপূরণীয় কাজ।
অবশ্য এতে স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু খারাপ নয়। ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার, তাজমহল, গিজার পিরামিড কিংবা হা লং বে— সবই অসাধারণ দর্শনীয় স্থান। কিন্তু এর একটি মূল্যও রয়েছে। পর্যটকের ভিড়ে এসব জায়গা অনেক সময় এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যায় যে সবাই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ধরনের ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করেন।
চীনের ঝাংজিয়াজিয়ের অপূর্ব ‘অ্যাভাটার পাহাড়’ও হাজার হাজার মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটার সময় তার সৌন্দর্যের অনেকটাই হারায়। তাহলে কি প্যারিসে গিয়ে আইফেল টাওয়ারের সামনে ছবি না তুললে, নিউইয়র্কের কাটজ’সে স্যান্ডউইচ না খেলে কিংবা বালিতে অতিরিক্ত দামের ফটো বুথে ছবি না তুললে জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়?
আমিও এর বাইরে নই। চলতি বছরের শুরুতেই সময়ের প্রচণ্ড সংকটের মধ্যে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে গিয়ে অন্য সব শিল্পকর্ম প্রায় উপেক্ষা করে ছুটে গিয়েছিলাম ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের বিখ্যাত ‘দ্য স্টারি নাইট’ দেখার জন্য।
দুঃখজনক বিষয় হলো, ‘বাকেট লিস্ট’ মানসিকতা অনেক জায়গাকে কেবল ‘করনীয় তালিকায়’ পরিণত করেছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যকে সরল ‘দেখেছি’ অথবা ‘দেখিনি’— এই দুই বিকল্পে নামিয়ে এনেছে। অথচ ভ্রমণের প্রকৃত আনন্দ হলো মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে ডুবে যাওয়া এবং নতুন খাবারের স্বাদ নেওয়া। খুব কম ক্ষেত্রেই ভ্রমণের সেরা স্মৃতি হয় তোলা ছবিগুলো।
আগের ভ্রমণগুলোর কথা ভাবলে আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মানুষের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। ফিলিপাইনের সিয়ারগাওয়ের সুন্দর সৈকত অবশ্যই উপভোগ্য। কিন্তু সান মিগেল বিয়ারের কয়েক বোতল খেয়ে, আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুসহ কয়েকজন স্থানীয় ফিলিপিনোর সঙ্গে রাস্তার পাশের একটি অস্থায়ী বারে বসে কারাওকে গাওয়ার স্মৃতি—সেটিই হয়তো সারাজীবন মনে থাকবে। সেই বারটি একটি সুনামির পর নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল।
তাই এখন সময় এসেছে একটু থামার। ‘বাকেট লিস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’-কে না বলার। নিজের মতো করে ভ্রমণ করার এবং শহর ও দর্শনীয় স্থানগুলোকে কোনো ভিডিও গেমের একেকটি স্তরের মতো দ্রুত পার করে যাওয়ার বদলে সেগুলোকে অনুভব, বোঝা ও উপভোগ করার।