একসময় শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি পথজুড়ে জিপগাড়ির প্রধান কাজ ছিল মানুষ ও কৃষিপণ্য পরিবহন। খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগান ও পাহাড়ি জনপদ থেকে লেবু, আনারস, পানসহ নানা পণ্য নিয়ে শহরে ফিরত এসব গাড়ি। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। পর্যটনকেন্দ্রিক শ্রীমঙ্গলে এখন একই জিপ রঙিন সাজে পর্যটকদের নিয়ে ছুটছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে। স্থানীয়দের কাছে এসব খোলা ছাদের গাড়ি পরিচিত ‘চান্দের গাড়ি’ নামে।
শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের সামনে এখন প্রায়ই সারিবদ্ধভাবে দেখা যায় এসব গাড়ি। ট্রেনে আসা পর্যটকদের অপেক্ষায় থাকেন চালকেরা। দলবেঁধে আসা ভ্রমণকারীরা দরদাম করে গাড়িতে ওঠেন। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় চা-বাগান, লাউয়াছড়া, খাসিয়া পল্লীসহ আশপাশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়।
২৪ বছর ধরে জিপ চালাচ্ছেন বদরুল ইসলাম। তার চোখের সামনে বদলে গেছে এই পরিবহনব্যবস্থা। একসময় পাহাড়ি এলাকা থেকে লেবু, আনারস ও পান এনে শহরে বিক্রি করতেন। খাসিয়া জনগোষ্ঠী ও চা-বাগান এলাকার মানুষের যাতায়াতেও জিপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাহন।
বদরুল বলেন, ‘আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত করতে হতো। এখন পর্যটকদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। পর্যটকদের চাহিদা বাড়ায় অনেকেই জিপকে নতুনভাবে সাজিয়ে চান্দের গাড়ি বানিয়েছেন।’
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জিপ চালাচ্ছেন রাখাল দাশ। একসময় আলিয়াছড়া পুঞ্জি, শিসোলবাড়িসহ পাহাড়ি এলাকার পথে চলাচল করতেন। এখন পর্যটকদের নিয়ে এক দর্শনীয় স্থান থেকে আরেকটিতে ঘুরে বেড়ান।
তার ভাষায়, ‘আগে মানুষ ও মালামাল পরিবহন করতাম। এখন পর্যটকরাই প্রধান যাত্রী।’
পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে জিপের অর্থনীতিও। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে অনেক মালিক গাড়ি রঙিন করে সাজিয়েছেন। কোথাও নতুন আসন, কোথাও নিরাপত্তাবেষ্টনী, আবার কোথাও খোলা ছাদের নকশা যুক্ত হয়েছে।
পাঁচ বছর ধরে চান্দের গাড়ি চালাচ্ছেন সাব্বির। বাবার কাছ থেকেই জিপ চালানো শিখেছেন। তার মতে, খোলামেলা পরিবেশে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অনুভূতির কারণেই পর্যটকেরা এসব গাড়ি পছন্দ করেন।
শ্রীমঙ্গলের পর্যটন ব্যবস্থায় জিপের এই পরিবর্তন স্থানীয় পরিবহন সংস্কৃতিরও একটি উদাহরণ। একসময় যে গাড়ি পাহাড় থেকে লেবু-আনারস নামিয়ে আনত, সেটিই এখন পর্যটকদের নিয়ে ছুটছে সবুজের পথে। কিছু জিপ এখনো কৃষিপণ্য বহন করে। ফলে পুরোনো ব্যবহার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং পর্যটনের চাহিদার সঙ্গে নতুন একটি ভূমিকা যুক্ত হয়েছে।