স্ফটিকস্বচ্ছ নীল জল, সাদা বালুর সৈকত আর সমুদ্রের ওপর নির্মিত বিলাসবহুল ভিলা—এমন দৃশ্য বলতেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে মালদ্বীপের ছবি। 
তবে এবার সেই ধারণা আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে চায় সৌদি আরব। দেশটি লোহিত সাগরের তীরে গড়ে তুলছে এমন একটি বিলাসবহুল পর্যটন গন্তব্য, যেখানে থাকবে অক্ষত দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর, মরুভূমি ও পাহাড়ের অনন্য সমন্বয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউরো নিউজ লিখেছে, সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলে গড়ে উঠছে বিশ্বের অন্যতম উচ্চাভিলাষী পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প 'দ্য রেড সি'। প্রায় ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্পে রয়েছে ৯০টিরও বেশি অক্ষত দ্বীপের একটি দ্বীপপুঞ্জ। তবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং এক্সক্লুসিভ পরিবেশ বজায় রাখতে এর মধ্যে মাত্র ২২টি দ্বীপে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হবে।
রেড সি গ্লোবালের ডেভেলপমেন্ট প্রধান স্টিফেন চিজব্রো বলেন, “প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় আমরা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

মালদ্বীপের চেয়েও বৈচিত্র্যময়
লোহিত সাগরের এই প্রকল্পের সঙ্গে মালদ্বীপের তুলনা প্রায়ই করা হয়। তবে স্টিফেন চিজব্রোর মতে, মিল এখানেই শেষ।
তার ভাষায়, “দ্বীপ, স্বচ্ছ পানি আর সাদা বালুর সৈকতের কারণে মালদ্বীপের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। এখানে শুধু দ্বীপ নয়, রয়েছে পাহাড়, আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং দীর্ঘ অক্ষত উপকূল।”

তিনি বলেন, একজন পর্যটক সকালে প্রবালপ্রাচীরের মাঝে স্কুবা ডাইভিং করতে পারেন, আবার বিকেলে মরুভূমি ঘুরে রাতে পাহাড়ে বসে রাতের খাবার উপভোগ করতে পারেন। বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই এত কম দূরত্বের মধ্যে এমন বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
সৌদি আরবের ১,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অক্ষত উপকূল, প্রায় অবিকৃত প্রবালপ্রাচীর এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ। লক্ষ্য এমন পর্যটকদের টানা, যারা মালদ্বীপ বা ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রচলিত বিলাসবহুল গন্তব্য ঘুরে নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজ করছেন।

পুনরুজ্জীবনমূলক পর্যটনের ওপর জোর
এই প্রকল্পে শুধু বিলাসিতা নয়, গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে 'রিজেনারেটিভ ট্যুরিজম' বা পুনরুজ্জীবনমূলক পর্যটনে। এটি প্রচলিত টেকসই পর্যটনের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে।
স্টিফেন চিজব্রো বলেন, “এখন শুধু প্রকৃতি রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেটিকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন। আমরা দেখাতে চাই, বড় একটি পর্যটন গন্তব্য গড়ে তুলেও পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভব।”
এই প্রকল্পের পুরো অবকাঠামো পরিচালিত হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। ব্যবহৃত সব পানি পুনর্ব্যবহার করা হবে এবং বর্জ্য যেন ডাম্পিংয়ে না যায়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তার মতে, করোনা মহামারির পর বিলাসবহুল ভ্রমণকারীদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসেছে। তারা শুধু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতাই চান না, একই সঙ্গে জানতে চান তাদের ভ্রমণ পরিবেশবান্ধব কি না।

সৌদি আরব ঘোরার প্রবেশদ্বার
বর্তমানে 'দ্য রেড সি' প্রকল্পে ১১টি হোটেল চালু রয়েছে। আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক রিসোর্ট চালু হবে, বিশেষ করে শুরা দ্বীপে, যাকে পুরো প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

এখানে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, মেরিনা এবং ১৮ হোলের চ্যাম্পিয়নশিপ গলফ কোর্স থাকবে।
শুধু বিলাসবহুল আবাসন নয়, পর্যটকদের জন্য রয়েছে স্কুবা ডাইভিং, নৌভ্রমণ, হাইকিং, বিভিন্ন জলক্রীড়া এবং নতুন 'অ্যাড্রেনা' এলাকা, যেখানে ২০টিরও বেশি অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমের পাশাপাশি সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় লবণাক্ত পানির সার্ফিং পুল নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ চান না পর্যটকেরা শুধু রিসোর্টেই সীমাবদ্ধ থাকুন।
চিজব্রো বলেন, “অনেক অতিথি এখান থেকে আলউলা, জেদ্দাসহ সৌদি আরবের অন্যান্য গন্তব্যেও ভ্রমণ করেন। আমরা চাই 'দ্য রেড সি' পুরো সৌদি আরব ঘোরার প্রবেশদ্বার হয়ে উঠুক।”

সারা বছর পর্যটক টানার লক্ষ্য
সৌদি আরব শুধু শীতকালীন গন্তব্য—এ ধারণা বদলাতে চায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। তাদের লক্ষ্য বছরের ১২ মাসই পর্যটক আকর্ষণ করা।
চিজব্রো বলেন, “আমরা মৌসুমি গন্তব্য হতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য এমন ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করা, যারা বিলাসিতা, প্রকৃতি, সমুদ্র, অ্যাডভেঞ্চার এবং আসল সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা খুঁজে বেড়ান।”
বর্তমানে রেড সি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রিয়াদ, জেদ্দা, দুবাই, দোহা ও ইতালির মিলান শহরের সঙ্গে সংযুক্ত। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরটি ৭৮ হাজারের বেশি যাত্রী এবং প্রায় ২ হাজার বিমান চলাচল পরিচালনা করেছে।
নতুন হোটেল চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের আরও কয়েকটি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

২০৩০ সালের বড় লক্ষ্য
২০৩০ সালের মধ্যে 'দ্য রেড সি' প্রকল্পে ৫০টি হোটেল, প্রায় ৮ হাজার কক্ষ এবং এক হাজারের বেশি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তখন বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটককে স্বাগত জানানোর সক্ষমতা অর্জন করবে এই গন্তব্য।
স্টিফেন চিজব্রোর ভাষায়, “বিশ্ব সব সময় নতুন গন্তব্য খুঁজে। 'দ্য রেড সি' শুধু আরেকটি বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়, বরং এমন একটি নতুন জায়গা, যেখানে প্রকৃতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, আতিথেয়তা ও অনন্য অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিলেছে।”
প্রকল্পটি সফল হলে সৌদি আরব শুধু নতুন একটি বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্যই পাবে না, বরং প্রমাণ করবে যে বিলাসবহুল পর্যটনও পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের সহায়ক হতে পারে।