দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার বরফঢাকা আগ্নেয়গিরির চূড়ায়, যেখানে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি ও হিমশীতল আবহাওয়ার কারণে মানুষের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব, সেখানে অনায়াসে বসবাস করছে আন্দিজ লিফ-ইয়ার্ড ইঁদুর। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশেষ জিনগত অভিযোজন, কার্যকর শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিষাক্ত উদ্ভিদ হজমের সক্ষমতাই এ ক্ষুদে স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী হিসেবে টিকে থাকতে সহায়তা করছে।

বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণাটি জানায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ মিটার বা ২২ হাজার ফুট উচ্চতায় বসবাসকারী এ প্রাণীর মতো এত উঁচুতে অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্থায়ী বসবাসের নজির নেই।

গোলাকার পাতার মতো কানের জন্য পরিচিত এই ইঁদুরটি দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালায় বসবাস করে। প্রতিবেদনে ভুলবশত দক্ষিণ আফ্রিকার উল্লেখ থাকলেও গবেষণাটি উত্তর চিলির মরুভূমি উপকূল থেকে আন্দিজের বরফাবৃত পর্বতশৃঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের প্রাণিবৈচিত্র্য নিয়ে পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কার বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জে স্টর্স বলেন, ৬ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অর্ধেকেরও কম এবং তাপমাত্রা প্রায় সব সময় হিমাঙ্কের নিচে থাকে। এমন পরিবেশে প্রশিক্ষিত একজন পর্বতারোহীও সীমিত সময়ের বেশি টিকে থাকতে পারেন না।

গবেষকরা বিভিন্ন উচ্চতা থেকে সংগৃহীত ১৬৭টি ইঁদুরের পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, উচ্চভূমির ইঁদুরগুলো কম অক্সিজেনেও শক্তি উৎপাদনে অনেক বেশি দক্ষ। তাদের পেশিকোষের মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা বেশি এবং দেহের ব্রাউন ফ্যাট তাপ উৎপাদনে কার্যকরভাবে কাজ করে। ফলে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এ প্রাণীগুলোর মধ্যে এমন জিনগত অভিযোজন রয়েছে যা বিষাক্ত উদ্ভিদ হজমে সহায়তা করে। উচ্চভূমিতে খাদ্যের উৎস সীমিত হওয়ায় এই সক্ষমতা তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সহ-গবেষক গিইয়্যের্মো দে'লিয়া জানান, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা এবং খাদ্যের বিষাক্ত উপাদান বিপাকে জড়িত কয়েকটি জিনে বিবর্তনগত পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে। তবে ঠিক কোন উদ্ভিদ বা বিষাক্ত উপাদানের বিরুদ্ধে এই অভিযোজন তৈরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গবেষকদের মতে, কম অক্সিজেনের পরিবেশে প্রাণীর অভিযোজন বোঝার মাধ্যমে ভবিষ্যতে হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে সহায়তা মিলতে পারে।

আন্দিজ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্বত পর্যটন গন্তব্য। এই গবেষণা শুধু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বই তুলে ধরেনি, বরং উচ্চ পর্বতাঞ্চলের অনন্য বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • সর্বোচ্চ বসবাসের উচ্চতা: ৬,৭০০ মিটার
  • প্রাণী: আন্দিজ লিফ-ইয়ার্ড ইঁদুর
  • গবেষণা প্রকাশ: সায়েন্স
  • বিশ্লেষণ করা নমুনা: ১৬৭টি
  • প্রধান বৈশিষ্ট্য: কম অক্সিজেনে শক্তি উৎপাদন, কার্যকর মাইটোকন্ড্রিয়া, বিষাক্ত উদ্ভিদ হজমের জিনগত সক্ষমতা