লেখা: নাজমুল হুদা
কখনো কখনো ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো তৈরি হয় খুব হঠাৎ করেই। পরিকল্পনা থাকে না, থাকে না বড় কোনো আয়োজনও। থাকে শুধু প্রিয় কিছু মানুষের ডাক, কিছু আন্তরিকতা, আর পরিচিত কোনো জনপদকে নতুন চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষা। আমার জন্য তেমনই এক ভ্রমণের নাম, "সিরাজগঞ্জে একদিন।"
ঘটনার শুরু এক ফোনকল দিয়ে। পুরনো সহকর্মী নেহাল আজমত ভাই ফোন করে জানালেন, আগামী শনিবার ওয়াটারএইডের কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে তিনি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে গোলামের হোটেলে খেতে যেতে চান। আমি যদি সঙ্গে যাই, তাহলে নাকি খুব ভালো হয় কারণ আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জ, কাজেই আমি এই সফরে একরকম ‘লোকাল গাইড’-এর ভূমিকায় থাকতে পারব।
নেহাল ভাইয়ের অনুরোধ ফেলবার সাধ্য আমার সত্যিই নেই। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। মোহাম্মদপুর থেকে ধানমন্ডি, প্রতিদিন একসঙ্গে যাতায়াত, অফিসে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ । এই দীর্ঘ সহযাত্রা থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটি হয়ে উঠেছে নিছক সহকর্মীর চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক। মানুষ হিসেবে নেহাল ভাইয়ের একটি বিশেষ গুণ সবসময় আমাকে মুগ্ধ করেছে, তিনি আপ্যায়ন করতে জানেন, এবং সেটা করেন অত্যন্ত যত্ন ও মনোযোগ দিয়ে। কে কী খেতে পছন্দ করে, কার কোন সময়ে কী প্রয়োজন এসবকিছুই তাঁর খেয়ালে থাকে। এমনকি কারও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংকটে, যখন ঠিকমতো রান্না করা বা নিজের দেখভাল করাও কঠিন হয়ে ওঠে, তখনও তিনি প্রিয় খাবার নিয়ে হাজির হতে পারেন। এই আন্তরিকতাই হয়তো তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
যাত্রা শুরু: ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ
সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে আমরা রওনা দিলাম শনিবার, ২০ জুন, সকাল সাতটায়, ঢাকা থেকে। যাত্রার শুরুতেই গাড়ির ভেতরে জমে উঠল ফুটবল-আড্ডা। তখন চলছিল ব্রাজিল ও হাইতির খেলা, আর সেই সূত্র ধরে গাড়ির ভেতরে শুরু হয়ে গেল ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার সমর্থকদের তর্ক-বিতর্ক। ভ্রমণের শুরুটা তাই হয়ে উঠল বেশ প্রাণবন্ত।
আমরা পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাজীপুর হয়ে এনায়েতপুরের পথে রওনা দিলাম। যাত্রা শুরুর দেড় ঘন্টা পর টাঙ্গাইলের ঘরোয়া হোটেলে সেরে নেওয়া হলো সকালের হালকা নাশতা। আমরা তিন ঘণ্টার মধ্যেই সিরাজগঞ্জ প্রবেশ করলাম।
জুনের তপ্ত রোদেল শান্তি বাহেলা জামে মসজিদ
পথে প্রথমেই চোখে পড়ে বেলকুচির বাহেলা জামে মসজিদ। জুনের তপ্ত রোদে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন মসজিদের ভেতরে ঢুকলাম, ভেতরের শীতলতা ও কারুকাজ মুহূর্তেই যেন দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুছে দিল। ভ্রমণে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা গন্তব্যের মতোই স্মরণীয় হয়ে ওঠে। বাহেলা জামে মসজিদের সেই বিরতি ছিল তেমনই একটি।
এনায়েতপুরের পথে, বেরিবাঁধের বাতাসে
দুপুর পৌনে বারোটার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম এনায়েতপুরে। গন্তব্য ছিল প্রসিদ্ধ গোলামের হোটেল। কিন্তু তখনও তেমন ক্ষুধা জাগেনি। তাই আমরা ঠিক করলাম, আগে একটু ঘুরে আসা যাক। খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজের পাশ ঘেঁষে ও গোলামের হোটেলে ঠিক সামনে দিয়েই ৫০০ মিটার সামনে চলে গেলাম এনায়েতপুরের বেরিবাঁধে। প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে কাটালাম।
নদীর ঢেউ, খোলা আকাশ আর দুর্দান্ত বাতাসের এই ছোট্ট বিরতিটুকুই যেন পুরো ভ্রমণকে অন্য মাত্রা দিল। শহরের ক্লান্ত জীবন থেকে বেরিয়ে এমন মুক্ত বাতাসে দাঁড়ালে মনে হয়, প্রকৃতি এখনো মানুষের মনকে খুব সহজেই ভালো করে দিতে জানে।
আমি আগে থেকেই জানতাম, গোলামের হোটেলে দুপুর সাড়ে বারোটার পর থেকে আড়াইটা-তিনটা পর্যন্ত প্রচণ্ড ভিড় থাকে। অনেক সময় সিরিয়াল নিয়ে খেতে হয়। তাই আমরা হিসাব করেই সাড়ে বারোটার দিকে ফিরে গেলাম হোটেলে।
গোলামের হোটেল: নদীর মাছের রান্নায় এনায়েতপুরের স্বাদ
এই ভ্রমণের মূল আকর্ষণ ছিল নিঃসন্দেহে গোলামের হোটেল। সেখানে বসে আমরা খেলাম; চিংড়ি, বাছা, ঘাইরা, আইর, বাঁশপাতারি, বাইলা এবং নদীর পাঁচমিশালি মাছের রান্না।
খাবারগুলোর স্বাদ নিয়ে বাড়তি বিশেষণ ব্যবহার না করলেও চলে; কারণ কিছু স্বাদ থাকে, যা ভাষার চেয়ে স্মৃতিতে বেশি দিন টিকে থাকে। এই মাছগুলোর রান্না ঠিক তেমনই। তপ্ত দুপুরে, চৌকিতে বসে, একেবারে তাজা নদীর মাছের রান্না কেবল মধ্যাহ্নভোজ ছিল না, বরং ছিল সিরাজগঞ্জের নদীমাতৃক খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয়।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে, খাবারের দামও যথেষ্ট সাশ্রয়ী। এখানকার বেশিরভাগ মাছের প্লেট ১৫০ টাকা, আর পরিমাণেও যথেষ্ট উদারতা আছে।
নেহাল ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন তাঁর আরও চার সহকর্মী—খইরাম, সাখাওয়াত, সোহান ও মনির ভাই। খাবার শেষে সবার মুখেই ছিল সন্তুষ্টির ছাপ।
মনির ভাই বললেন, তিনি এই খাবার খুব পছন্দ করেছেন, আবার আসবেন।এবার পরিবারকে নিয়ে।
সাখাওয়াত ভাইর মন্তব্য, “আমি অনেক ভাত খেয়েছি; সাধারণত এত ভাত খাই না।”
সোহান ভাই হাসতে হাসতে বললেন, “যে পরিমাণ ভাত খেলাম, এই গরমের মধ্যেও ঘামতে ঘামতে খেলাম! যদি উপরে ফ্যান থাকত, তাহলে আরও বেশি খেয়ে ফেলতাম।”
আর খইরামর মতে, “শেষে চিংড়ি মাছ নেওয়াটা নেহাল ভাই খুব ভালো করেছেন; ফিনিশিংটা চিংড়ি দিয়ে হওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হয়েছে।”
নেহাল ভাই নিজেও খাবারটি এতটাই পছন্দ করলেন যে পরিবারের জন্য পার্সেলও নিয়ে নিলেন।
কেজির মোড়ে পান্তুয়া: ছোট্ট বিরতিতে মিষ্টি সুখ
এনায়েতপুর থেকে আমরা রওনা দিলাম শাহজাদপুরের উদ্দেশে। যাত্রার শুরুতেই এনায়েতপুরের কেজির মোড়ে থামলাম রনি মিষ্টান্ন ভান্ডারে। সেখানে খাওয়া হলো বিখ্যাত পান্তুয়া।
এখানে পান্তুয়া ৪০ টাকা পিস, আর এক কেজিতে ১৪টি, দাম ৫০০ টাকা। নরম, রসালো, আর স্বাদে ভরপুর এই পান্তুয়া যেন ভ্রমণের ভেতর এক মিষ্টি বিরতি। পথে-ঘাটে এমন কিছু স্বাদ থাকে, যা কোনো শহুরে ডেজার্টের চেয়েও অনেক বেশি মনে থাকে।
শাহজাদপুর: কাচারিবাড়ির সামনে একটু আক্ষেপ
পথে গ্রামীণ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম শাহজাদপুরে। শাহজাদপুরে বাঙ্গালা নদীর কল ঘেঁষে মাজার পেরিয়ে দুপুর আড়াইটার পর পৌঁছালাম রবীন্দ্র কাচারিবাড়িতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানা গেল, জাদুঘরে মেরামতের কাজ চলছে, তাই তিন মাসের জন্য সেটি বন্ধ থাকবে। স্বাভাবিকভাবেই মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। এত দূর এসে রবীন্দ্র-স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটির ভেতরটা দেখতে না পারার আক্ষেপ থেকেই যায়।
তবে ভ্রমণ তো থেমে থাকে না। তাই আমরা সেখান থেকে ঢুকে পড়লাম লুঙ্গির হাটে। যদিও মূল হাট বসে রবিবার, তবু শনিবারেও হাটের কিছু অংশ জমে ওঠে। আমরা সবাই সেখান থেকে লুঙ্গি কিনলাম যা একদিকে স্থানীয় ঐতিহ্যের স্মারক আবার অন্যদিকে ব্যবহারিকও বটে।
বৃষ্টি নামল, গরম কমল, সামনে সলপের ঘোল
লুঙ্গির হাট থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা দিলাম সলপের ঘোল খেতে। আর তখনই নামল মুষলধারে বৃষ্টি। সারা দিনের অসহনীয় গরমের পর সেই বৃষ্টি যেন পুরো সফরে এনে দিল এক অন্যরকম স্বস্তি। আমরা সবাই তখন গরমে হাঁসফাঁস করছিলাম; বৃষ্টি এসে যেন ক্লান্ত শরীরের ওপর শীতল হাত রাখল।
আমরা পৌনে চারটার দিকে পৌঁছালাম সলপে, গন্তব্য সলপ ঘোলঘর। পাশাপাশি দুটো ঘোলঘর আব্দুল মালেকের এবং আব্দুল খালেকের। আমরা আব্দুল খালেকেরটাতে গিয়ে আমরা খেলাম ঘোল এবং মাঠা। দুটোই ভালো। তবে সলপের আশেপাশের এলাকাতে সলপ গোল ঘর নামে অনেক দোকান রয়েছে। ঠিক যেমন রয়েছে কুমিল্লায় মাতৃভান্ডার। এখানকার ঘোল এবং মাঠা বিক্রি হয়ে নিচের দামে।
- ঘোল – ৮০ টাকা লিটার
- মাঠা – ১০০ টাকা লিটার
আর স্বাদ?—অতুলনীয়। সলপের ঘোল নিয়ে আলাদা করে নতুন কিছু বলার নেই; এর সুনাম বহুদিনের। তবে গরমের দিনে ভ্রমণের ক্লান্তি নিয়ে সেখানে বসে ঠান্ডা ঘোল খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে আলাদা। সঙ্গে কিছু ঘোল এবং মাঠা কিনে নিয়ে আমরা ঢাকায় এসেছি।
কাঁঠাল, দুধ আর নদীর পাড়ে সন্ধ্যা
সলপে গিয়ে আরেকটি আনন্দের বিষয় ঘটল । সেখানে আমরা বড় দুইটি কাঁঠাল কিনলাম মাত্র ১০০ টাকায়। ঢাকায় যেগুলোর দাম ৪০০ টাকার নিচে হওয়ার কথা নয়, সেগুলো এখানে মিলল অবিশ্বাস্য কম দামে। এই এক জায়গাতেই গ্রামের বাজারের সঙ্গে শহরের ফারাকটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
সেখান থেকে আমরা সরাসরি চলে গেলাম চায়না বাঁধ থ্রিতে। নদীর পাড়ে অনেকক্ষণ আড্ডা, উইন্ড টারবাইনের সঙ্গে ছবি তোলা, বিকেলের আলো-হাওয়া উপভোগ, সব মিলিয়ে দিনের শেষভাগটুকু হয়ে উঠল খুবই প্রশান্তিময়। পিছনে যমুনা সেতু ও যমুনা রেল সেতু এবং সামনে ডুবতে থাকা লাল সূর্য সত্যিই অতুলনীয় মুহূর্ত।
সন্ধ্যার দিকে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথে ৭০ টাকা লিটার দুধ কিনলাম। আর রাত দশটার মধ্যেই ফিরে এলাম ঢাকায়।
নিজের জেলায় নতুন করে ফিরে দেখা
একদিনের এই সিরাজগঞ্জ সফর আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল, ভ্রমণ মানেই দূরের পাহাড়, সমুদ্র বা বিলাসী রিসোর্ট নয়। ভ্রমণ হতে পারে নিজের জেলাতেও, যদি সেই জায়গাটিকে নতুন চোখে দেখা যায়। এনায়েতপুরের নদীর বাতাস, গোলামের হোটেলের মাছ, কেজির মোড়ের পান্তুয়া, শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ির আক্ষেপ, লুঙ্গির হাট, সলপের ঘোল, বৃষ্টিভেজা বিকেল, নদীর ধারের আড্ডা সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জের এই একদিন ছিল স্বাদ, স্মৃতি আর সঙ্গের এক অনন্য সমন্বয়।
সবচেয়ে মজার বিষয়, পুরো সফরে নেহাল ভাই ও তাঁর সহকর্মীরা আমাকে একটি নাম দিয়েছিলেন“লোকাল গাইড"। আর আমি মনে মনে ভেবেছি, এই নামটুকু হয়তো মন্দ নয়। কারণ নিজের জেলায় নিজেই টুরিস্ট হয়ে ওঠার আনন্দ সত্যিই আলাদা।
সিরাজগঞ্জে একদিনের সফর শেষে আমার মনে হয়েছে নিজের মাটিকে নতুন করে দেখার জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না; দরকার শুধু একটু সময়, কিছু প্রিয় মানুষ, আর পথের প্রতি ভালোবাসা।