পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে
পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের প্রত্যাশা ছিল পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বাস্তব চিত্র তাদের সেই আশা পূরণ করতে পারেনি। ঈদের দ্বিতীয় দিন এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও সৈকত এলাকায় দেখা যায়নি কাঙ্ক্ষিত পর্যটক সমাগম। ফলে হোটেল-মোটেল মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে লোকসানের আশঙ্কা।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকতখ্যাত কুয়াকাটায় প্রতিবছর ঈদকে ঘিরে পর্যটকদের ঢল নামে। সৈকত এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল, আর আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে কক্ষ পাওয়া যায় না বললেই চলে। তবে চলতি বছরের ঈদ মৌসুমে সেই পরিচিত চিত্রের দেখা মেলেনি।
কুয়াকাটার প্রায় ২৩০টির বেশি আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসের অধিকাংশেই প্রত্যাশিত বুকিং হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে কক্ষ বুকিংয়ের হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে অর্ধেকেরও বেশি কক্ষ খালি পড়ে আছে।
হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে ঘিরে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ, সংস্কার ও অন্যান্য প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করা হলেও পর্যটক কম থাকায় লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
হোটেল বেস্ট সাউদার্নের পরিচালক মো. সাকুর বলেন, “আমাদের হোটেলের ৩২টি কক্ষের মধ্যে এবার মাত্র ১৯টি বুকিং হয়েছে। গত ১০ বছরে এমন নীরব ঈদ মৌসুম আমরা দেখিনি।”
কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্ট, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি, ঝাউবন, ব্লক পয়েন্ট এবং তিন নদীর মোহনাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটকের উপস্থিতি অনেক কম।
এর প্রভাব পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। ভ্রাম্যমাণ দোকানদার, ফটোগ্রাফার, স্পিডবোট চালক, মোটরসাইকেলচালক ও ঘোড়ার মালিকেরা অধিকাংশ সময়ই বসে থাকছেন ক্রেতা ও যাত্রীর অপেক্ষায়।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা পর্যটক কম হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাভাব, যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ে সাধারণ মানুষের সংযমী মনোভাব এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইব্রাহিম ওয়াহিদ বলেন, কুয়াকাটার সামগ্রিক অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে শুধু হোটেল-রেস্টুরেন্ট নয়, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তিনি জানান, বুকিংয়ের এই নাজুক পরিস্থিতিতে হোটেল কর্মচারীদের মধ্যেও চাকরি ও বেতন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি নিয়ে এখনই হতাশ নন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ছুটি থাকায় আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। যদিও শুরুতে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে ঈদ-পরবর্তী দিনগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।”
পর্যটক উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো শৈথিল্য রাখেনি প্রশাসন। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ জয়ন্ত কুমার বলেন, “সৈকতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ এবং পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশা, ঈদের বাকি ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।