সাইমুম
কোনো দেশ বা ভ্রমণ স্মরণীয় হওয়ার জন্য বড় কোনো স্থাপনা, বিলাসবহুল কোনো হোটেল বা বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র কখনোই অপরিহার্য নয়। কখনো কখনো ছোট্ট একটা ঘটনা, ছোট্ট একটা মুহূর্ত কিংবা এক চিলতে আতিথেয়তা মনে দাগ ফেলতে পারে, বদলে দিতে পারে পুরো দেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা।
আমার কাছে থাইল্যান্ড এমনই এক পর্যটন-গন্তব্য, যেখানে বারবার যেতে ইচ্ছে করে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা আধুনিক নগরজীবনের জন্য নয়; বরং মানুষের অসাধারণ আতিথেয়তার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেসব পর্যটনকেন্দ্রে আমার পা পড়েছে, তাতে আতিথেয়তার কমতি চোখে পড়েছে।
থাইল্যান্ডে আমার স্মরণীয় ভ্রমণটি ছিল ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাইল্যান্ড। এর আগেও কয়েকবার দেশটিতে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা ছিল নানা কারণে বিশেষ। আর নানা বিশেষত্বের একটি হলো, বিয়ের পর স্ত্রী শিফতি হাসানকে সঙ্গে নিয়ে এটিই ছিল আমার প্রথম থাইল্যান্ড ভ্রমণ।
ভ্রমণের শুরুতে আমরা পৌঁছাই ব্যাংককের বিখ্যাত চায়না টাউনে। বিটিএস স্কাইট্রেনে সাফান তাকসিন স্টেশনে নেমে একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁর খোঁজ করছিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেটি আর পাওয়া গেল না। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল ‘টিএনকেসি ফুড’ নামে একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁ। বাইরে মানুষের ভিড় দেখে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কারণ, কোনো এক ভ্রমণ টিপসে পড়েছিলাম, অচেনা শহরে ভালো রেস্তোরাঁ চেনার ভালো উপায় হলো, ভিড় দেখা।
রেস্তোরাঁ মালিকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি জানতে পারলেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি এমন আন্তরিকভাবে আমাদের স্বাগত জানালেন, যেন আমরা দুজন বহুদিনের পরিচিত অতিথি। নিজেই ভালো জায়গায় বসালেন, খাবারের পরামর্শ দিলেন এবং বারবার এসে খোঁজ নিলেন কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে কি না।
চিকেন ফ্রাই, কাও পারো চিকেন, সম টম সালাদ, ভারমিসিলিয়ন নুডলস্ স্যুপের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছিল একটি গ্রিন চিলি সস। প্রথমবার মুখে দেওয়ার পরই বুঝলাম, এটি অন্যরকম। ঝাল, টক আর সুগন্ধের এমন নিখুঁত সমন্বয় আগে কখনো পাইনি। এতটাই ভালো লেগেছিল যে আমি টানা বাটি খেয়ে ফেলেছিলাম।
আমার এমন আগ্রহ দেখে রেস্টুরেন্টের মালিক হেসে বললেন, "তোমার এত পছন্দ হয়েছে, এই আইটেমের জন্য কোনো টাকা দিতে হবে না।"
এরপর আরও যা করলেন, তা আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছে। তিনি নিজের হাতে কাগজে লিখে দিলেন সেই গ্রিন চিলি সসের রেসিপি, যেন আমি বাংলাদেশে ফিরে সেটি বানানোর চেষ্টা করতে পারি।
পরে আমি চিন্তা করলাম, ব্যাংককের মতো ব্যস্ত একটি শহর, সেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, যার সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র কয়েক মিনিটের, তিনি শুধু একজন অতিথিকে খুশি করার জন্য সময় নিয়ে রেসিপি লিখে দিচ্ছেন, খাবারের দাম মওকুফ করছেন এবং বিদায় জানাচ্ছেন হাসিমুখ নিয়ে। এটাই হয়ত আতিথেয়তা, এটাই হয়ত একটি দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য।
অতিথিপরায়ণতার সুনাম আমাদের দেশেরও রয়েছে। ‘অতিথি দেবো ভব’ বা ‘মেহমান আল্লাহর রহমত’- এমন বিশ্বাস আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই আন্তরিকতার অভাব চোখে পড়ে। অথচ একটি হাসিমুখ, কয়েকটি আন্তরিক কথা কিংবা একজন অতিথিকে বিশেষ অনুভব করানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি দেশের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
দেশে ফিরে এখনও যখন থাইল্যান্ড ভ্রমণের স্মৃতি মনে পড়ে, তখন কোনো শপিং মল, সুউচ্চ ভবন কিংবা দর্শনীয় স্থানের ছবি প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। সবার আগে ভেসে ওঠে সেই ছোট্ট রেস্তোরাঁর কথা, সেই গ্রিন চিলি সসের কথা, সেই অচেনা মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনার কথা।
হয়ত এ কারণেই থাইল্যান্ডে বারবার যেতে ইচ্ছে করে। কারণ, সেখানে আমি শুধু একজন পর্যটক ছিলাম না; একজন সম্মানিত অতিথিও ছিলাম। আর এমন অনুভূতি একজন ভ্রমণকারীর জন্য সত্যিই পরম এক অভিজ্ঞতা।