“না, ঘুরতে যেতে হবে না—বিয়ে হলে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে যাস।”
একসময় বাংলাদেশের বহু পরিবারে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলা এই কথাটি ছিল খুবই পরিচিত। এটি শুধু একটি পারিবারিক পরামর্শ নয়, বরং নারীর চলাচল ও স্বাধীনতা নিয়ে সমাজের গভীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সময় বদলেছে, সমাজ এগিয়েছে—কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পরিবর্তন হয়েছে?

গত এক দশকে বাংলাদেশে নারীদের ভ্রমণ, বিশেষ করে একা বা স্বাধীনভাবে চলাচল, দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, শহরাঞ্চলে নারীদের চলাচল আগের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ভ্রমণকারীদের উপস্থিতি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। ফলে “নারী একা ভ্রমণ (solo women travel)”—এই ধারণাটি আর সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক নয়।

তবে এই পরিবর্তন পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ও নয়। বাস্তবতা এখনো দ্বৈত। একদিকে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও সামাজিক মানসিকতার সীমাবদ্ধতা তাদের পথ রুদ্ধ করে রাখছে।

২০১০ থেকে ২০১৫ সালের সময়কালে বাংলাদেশে নারীদের একক ভ্রমণ (solo travel)  ছিল খুবই সীমিত। পরিবার ও সমাজের উপর নির্ভরশীলতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং নারীর একা চলাচলকে নেতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা ছিল প্রধান বাধা। ভ্রমণ তখন প্রায় সম্পূর্ণভাবেই পরিবার বা পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে সেই চিত্র কিছুটা বদলেছে। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও তরুণীদের মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ বেড়েছে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন সহায়ক উদ্যোগ, যেমন নারী পুলিশ, হেল্পলাইন এবং সচেতনতা কার্যক্রম, নারীদের চলাচল কিছুটা সহজ করেছে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো নিরাপত্তা। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, গণপরিবহনে অধিকাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হন। রাতে একা চলাচল এখনো অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সূচকেও নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।

এই বাস্তবতা শুধু ভ্রমণ নয়, নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

গ্রাম ও শহরের মধ্যেও বৈষম্য স্পষ্ট। শহরে সুযোগ ও নিরাপত্তা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলে সামাজিক বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো বড় বাধা। ফলে নারীদের ভ্রমণের স্বাধীনতা সমানভাবে বিস্তৃত হয়নি।

তারপরও ইতিবাচক দিক রয়েছে। গত এক দশকে নারী শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার এবং উন্নয়ন সংস্থার ভূমিকা নারীদের ভ্রমণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, বেশি আত্মবিশ্বাসী।

কিন্তু এই পরিবর্তনকে পূর্ণতা দিতে হলে শুধু ব্যক্তিগত সাহস নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—এই সবগুলোই জরুরি।

নারীর ভ্রমণ কেবল বিনোদন নয়, এটি তার স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় এবং সমঅধিকারের প্রতীক।

তাই আজকের প্রশ্নটি শুধু—নারীরা ভ্রমণ করছে কি না—তা নয়; বরং তারা কতটা নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করতে পারছে।

লেখক: জিন্নাতুন নেছা
নৃবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মী।