নেপাল মানেই কেবল কাঠমান্ডুর ধুলোবালি মাখা অলিগলি কিংবা থামেলের ভিড় নয়—আসল নেপালকে চিনতে হলে পাড়ি জমাতে হয় হিমালয়ের গহীন জনপদে। এমনই এক পাহাড়ঘেরা নিভৃত জনপদ হলো মুস্তাং জেলার মারফা গ্রাম। সম্প্রতি সেখানে কাটানো কিছু মুহূর্ত আমার কাছে মনে হয়েছে যেন কোনো এক রূপকথার পাতায় ঘুরে আসা। মারফাকে বলা হয় নেপালের ‘আপেলের রাজধানী’, আর সেখানে গিয়ে আমি যা দেখেছি এবং খেয়েছি, তার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে আমি যখন তিব্বতী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল এই মারফা ভিলেজে পৌঁছালাম, চারিদিকের শান্ত পরিবেশ আর হিমেল হাওয়া আমাকে এক নিমেষেই সতেজ করে তুলল। এখানকার আপেলের খ্যাতি দুনিয়া জোড়া, কিন্তু সরাসরি গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা না হলে বিশ্বাস করা কঠিন যে, এর স্বাদ পৃথিবীর অন্য সব জায়গার আপেল থেকে কতটা আলাদা। হিমালয়ের বরফগলা জল আর পাহাড়ের বিশুদ্ধ মাটি এই আপেলকে দিয়েছে এক অনন্য মিষ্টতা।

মারফার সরু গলিগুলো দিয়ে হাঁটার সময় চারদিকে শুধু আপেলের ঘ্রাণ। স্থানীয়রা এখানে আপেল কেবল টাটকাই খান না, তারা পরম মমতায় তৈরি করেন প্যাকেটজাত শুকনো আপেল। আমি কয়েক প্যাকেট সংগ্রহ করলাম, যার প্রতি প্যাকেটের দাম শুরু হয় মাত্র ৩০০ নেপালি রুপি থেকে। ভ্রমণে হালকা নাশতা হিসেবে এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।

তবে মারফার সবচেয়ে বড় চমক ছিল পাসাং শেরপাদের তৈরি বিশেষ পানীয়— যার নাম ‘মারফা ব্র্যান্ডি’। স্থানীয়রা নাশপাতি, আপেল এবং এপ্রিকট মিশিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই পানীয়টি তৈরি করেন। আমি যখন স্থানীয়দের সাথে কথা বলছিলাম, তারা জানালেন এই ব্র্যান্ডি তাদের সংস্কৃতিরই একটা অংশ। সাধারণত এক হাজার নেপালি রুপি থেকে এর দাম শুরু হয়। আর যারা এই কড়া পানীয়তে অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য রয়েছে পাহাড়ের টাটকা আপেলের বিশুদ্ধ জুস। এক গ্লাস জুস খাওয়ার পর শরীর আর মনের ক্লান্তি যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়। মারফার বাজারে কেজি প্রতি টাটকা আপেল মিলছে মাত্র দেড়শ নেপালি রুপিতে। এত সস্তায় এমন অর্গানিক আর সুস্বাদু ফল ভাবাই যায় না।

অনেকেই নেপাল গিয়ে কাঠমান্ডুর মন্দির আর বাজার দেখেই ফিরে আসেন, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায়—হিমালয়ের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে যেতেই হবে মারফার মতো কোনো পাহাড়ঘেঁষা জনপদে। পাহাড়ের বুক চিরে জেগে থাকা এই ছোট্ট শহরটিতে গিয়ে দাঁড়ালে আমার বারবার মনে হয়েছে, স্বর্গের বর্ণনায় আমরা যা যা শুনি, তার প্রায় পুরোটাই এখানে অবিকল মিলে যায়। আপনি যদি প্রকৃতির একদম কাছাকাছি গিয়ে অরিজিনাল আর অর্গানিক কিছু পরখ করতে চান, তবে মারফা আপনার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে।


লেখক: লুৎফর হাসান 
কবি, লেখক, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী